মহাবিশ্বের নানা মডেল

মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি (৯ম পর্ব)
মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি (৯ম পর্ব)
  1. মহাবিশ্ব, এই যাত্রার শেষ কোথায়?
  2. মহাবিশ্ব মাপার ফিতে
  3. মিল্কিওয়ে: আমাদের নক্ষত্রবাড়ি
  4. অন্যান্য গ্যালাক্সিরা
  5. মহাবিশ্বের মহাবিন্যাস
  6. মহাবিশ্বের মহাপ্রসারণ এবং তরঙ্গ কথন
  7. রেড শিফট এবং ডপলার ইফেক্ট
  8. অলবার্সের প্যারাডক্স
  9. মহাবিশ্বের নানা মডেল
  10. মহাবিশ্বের গাণিতিক প্রকৃতি
  11. মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ

আমি এখন মহাবিশ্বের এমন এক মডেল উপস্থাপন করতে চলেছি যেটা বর্তমানে খুব মার্কেট পেয়েছে, তবে চিল্লিয়ে নয়, তার গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে। সংশ্লিষ্ট কয়েকটা মডেলকে জড়ো করে তৈরি করা হয়েছে এই মডেল, জোড়াতালি দিয়ে নয়, জিগস পাজলের মতো খাপে খাপ মিলিয়েই এর রূপদান করা হয়েছে। মডেলটির নাম “স্ট্যান্ডার্ড মডেল”। একমাত্র এই স্ট্যান্ডার্ড মডেলই সমস্ত পর্যবেক্ষণের সাথে তাল মিলিয়ে এখন পর্যন্ত টিকে থাকতে পারছে, অন্য কোনো মডেল এর ধারেকাছেও নেই। মডেলটির বর্ণনা শুনে আপনাদের কাছে মনেই হবে না এটি কোনো এক মডেল, বরং মনে হবে আপনারা এইমাত্র বুঝি বাস্তব মহাবিশ্ব থেকে ঘুরে এলেন! কারণ এর বৈশিষ্ট্যগুলোকে নানান দিক থেকে পর্যবেক্ষণ করে একেবারে যুক্তির ছাঁচে ফেলে পরিশুদ্ধ করা হয়েছে।

বর্তমানে মহাবিশ্বের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মডেল হলো স্ট্যান্ডার্ড মডেল।

আমরা দেখেছি মহাবিশ্বটাকে যেকোনো দিক থেকে সদৃশ দেখায় এবং আমরা যতদূর পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছি তাতে মহাবিশ্বটাকে মোটামুটি সমসত্ত্বই মনে হয়, অর্থাৎ এর গ্যালাক্সিগুলো প্রায় অভিন্নভাবে বিন্যস্ত। এগুলো হচ্ছে মহাবিশ্বের বৈশিষ্ট্য। মহাবিশ্বের এইরকম আরও বৈশিষ্ট্য আছে, বৈশিষ্ট্যগুলো থেকে আমরা একটি কার্যকর মডেল তৈরি করার হিন্টস পাই, এই বৈশিষ্ট্যগুলোকে বলা হয় “মহাজাগতিক নীতি” (Cosmological Principle). মহাজাগতিক নীতি দুটো পর্যবেক্ষণ এবং একটি সুনির্দিষ্ট অনুমানের ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেগুলো হচ্ছে–

  • মহাবিশ্ব সর্বত্র সমসত্ত্ব
  • মহাবিশ্ব প্রতিটি দিক থেকে সদৃশ
  • পদার্থবিজ্ঞানের নীতি সমগ্র মহাবিশ্বে অভিন্ন

তবে আমাদের ক্ষুদ্র পরিসর থেকে এই সমসত্ত্ব এবং সাদৃশ্য সম্পর্কে কোনো ধারণা পাওয়া যায় না। অনেক বড়ো পরিসর থেকে মাপলে তখনই এর গড় মান মেলে। মহাবিশ্ব “মহাজাগতিক নীতি”র বাইরে যেতে পারে না। “মহাজাগতিক নীতি” পুরো মহাবিশ্বকে আমাদের কাছে একটি পূর্ণাঙ্গ বিকাশমান অবয়ব হিসেবে উপস্থাপন করে। এই নীতি বলে, মহাবিশ্ব কেবল র‍্যান্ডমলি ছড়িয়ে থাকা কিছু বিচ্ছিন্ন গ্যালাক্সির সমষ্টি নয়, বরং এটি এমন একটি পূর্ণাঙ্গ অবয়ব, যার প্রতিটি অংশ অন্য অংশগুলোর সাথে কোনো না কোনোভাবে সম্পর্কিত।

মহাজাগতিক নীতি আমাদের বলে আমরা কোন দিক থেকে মহাবিশ্বকে পর্যবেক্ষণ করছি সেটা ব্যাপার না, মহাবিশ্ব সব দিক দিয়েই সদৃশ।

“মহাজাগতিক নীতি” মহাবিশ্বের বড়ো পরিসরের কাঠামো সম্পর্কে জানাটা সহজ করে দেয়। যেমন, আমরা যদি লক্ষ করি তবে দেখব–দুটো সাধারণ গ্যালাক্সির মধ্যেকার দূরত্বের ক্ষেত্রে একটি সার্বজনীন ধ্রুবক রয়েছে, যার মান যেকোনো দুটো গ্যালাক্সির ক্ষেত্রে একইরকম, কীভাবে? চলুন দেখা যাক :

ধরি, দুটো গ্যালাক্সি, এরা হচ্ছে যথাক্রমে গ্যালাক্সি A আর গ্যালাক্সি B. এবং দুটো গ্যালাক্সিই মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের সাথে তাল মিলিয়ে একে অন্যের থেকে ব্যবধান বাড়াচ্ছে। অর্থাৎ, দুটো গ্যালাক্সির মধ্যেকার দূরত্ব হচ্ছে ∫AB (এই সংখ্যাটির মান A এবং B এর দূরত্বের ওপর নির্ভর করে)। এই ∫AB কে আরেকটি সংখ্যা R দিয়ে গুণ করলে পাই দূরত্ব ∫ABR.

∫AB কিন্তু সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয় না, তবে R সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তনশীল। এর মানে, মহাবিশ্বে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে সময়ের মান ভিন্ন। গণিতে R হচ্ছে সময়ের একটি ফাংশন, এদিকে ∫AB সময়ের বলয় থেকে মুক্ত।

মহাজাগতিক নীতির অন্যতম একটি স্বীকার্য হচ্ছে, যে কোনো দুটো সাধারণ গ্যালাক্সির মধ্যেকার দূরত্ব একটা প্যাটার্ন অনুসরণ করে পরিবর্তিত হবে। উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক দুটো সাধারণ গ্যালাক্সি C এবং D মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের কারণে দূরে সরছে, যা গাণিতিকভাবে প্রকাশ করলে দাঁড়ায়– ∫CDR, এখানে ∫CD কেবলমাত্র C এবং D মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের ওপর নির্ভর করে, সময় পরিবর্তনের সাথে এর কোনো হেরফের হবে না। এ থেকে আমরা পাচ্ছি, যদি কোনো নির্দিষ্ট সময়ে গ্যালাক্সি A এবং B এর মধ্যেকার দূরত্ব দ্বিগুণ হয় তাহলে ওই নির্দিষ্ট সময়ে একই দূরত্বে অবস্থিত গ্যালাক্সি C এবং D এর মধ্যেকার দূরত্বও দ্বিগুণ হবে। মোদ্দাকথা, সেই নির্দিষ্ট সময়ে সমদূরত্বে অবস্থিত যে কোনো দুটো গ্যালাক্সির মধ্যেকার দূরত্ব দ্বিগুণ হবে।

গ্যালাক্সি A থেকে B এর দূরত্ব যে হারে বাড়বে, B থেকে C এর দূরত্বও একই হারে বাড়বে, তখন দেখা যাবে A থেকে C এর দূরত্ব বাড়ার হার দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

মহাবিশ্বের বড়ো পরিসরের কাঠামো এবং ধরণকে R দ্বারা ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, যা সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়, এ কথা তো আগেই বলেছি। তবে সময়ের সাথে R কীভাবে পরিবর্তিত হয় সেটা নির্ধারণ করা কসমোলজির একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা। R এর পরিমাণকে মহাবিশ্বের স্কেল ফ্যাক্টর বা ব্যাসার্ধ বলা হয়। ব্যাসার্ধ শব্দটি এখানে কিছুটা বিভ্রান্তিমূলক, কারণ আমরা জানি–মহাবিশ্ব যদি অসীম হয় তাহলে একটা অসীম মহাবিশ্বের সসীম ব্যাসার্ধ বলে কিছু থাকতে পারে না। তবে মহাবিশ্বের স্থানিক পরিমাণ যদি সীমাবদ্ধ অর্থাৎ সসীম হয় এক্ষেত্রে R হবে মহাবিশ্বের সর্বাধিক দূরের দুটো পয়েন্টের সাথে সম্পর্কিত , মূলত এই অনিশ্চয়তার কারণে আমি R কে “স্কেল ফ্যাক্টর” হিসেবে অভিহিত করতে পছন্দ করি।

এবারে আসুন সহজে জেনে নিই জ্যোতির্বিদ এডউইন হাবলের সেই বিখ্যাত পর্যবেক্ষণ “মহাবিশ্বের গ্যালাক্সিদের সম্প্রসারণ” আদতে কী…

মনে করি একটি বেলুন ফোলানো হচ্ছে এবং বেলুনটির গায়ে অনেকগুলো বিন্দু আঁকা আছে, আরও মনে করি এই বেলুনের পৃষ্ঠভাগটিই একমাত্র স্পেইস, এর আশেপাশে স্পেইস বলতে কিছু নেই, আরও মনে করি বেলুনের পৃষ্ঠটিতে কেবল দ্বিমাত্রিক প্রাণীরা বাস করে, যারা পৃষ্ঠ ছেড়ে কোথাও যাবার ক্ষমতা রাখে না, এই বেলুনটিই তাদের কাছে পুরো মহাবিশ্ব। আরও মনে করি বেলুনের গায়ের একেকটা বিন্দু একেকটা আস্ত গ্যালাক্সি, বেলুনটি যতই ফুলে, প্রত্যেকটা বিন্দু একে অন্যের থেকে ততই দূরে সরে যায়, এবং এই দূরে সরে যাওয়ার হার যেকোনো সময়ে এক বিন্দু থেকে আরেকটি বিন্দুর দূরত্বের সমানুপাতিক। তো, হাবলের নীতি অনুসারে মহাবিশ্বের প্রসারণের ব্যাপারটা অনেকটা এরকমই

মহাবিশ্বের স্পেইসের সম্প্রসারণকে একটি ফুলতে থাকা বেলুনের সাথে তুলনা করা যেতে পারে।

অন্যভাবে, ধরুন কোনো পর্যবেক্ষক এই বিন্দুগুলোর একটিতে অবস্থান করছেন, তখন তিনি তার কাছ থেকে দূরে সরতে থাকা অন্য বিন্দুগুলোর দূরত্ব জানতে পারলেই সেই দূরত্বের সাথে একটি নির্দিষ্ট ধ্রুবক গুণ করে বলে দিতে পারবেন ওই বিন্দুগুলো ঠিক কত বেগে দূরে সরছে, একইভাবে শুধু দূরে সরার বেগ জানলেও একটি নির্দিষ্ট ধ্রুবক ব্যবহার করে বলে দিতে পারবেন বিন্দুগুলো তার থেকে কত দূরে অবস্থান করছে। তা তিনি যেকোনো বিন্দুই অবস্থান করেন না কেন এটা মূখ্য নয়। আর এই নির্দিষ্ট ধ্রুবকটিকেই বলা হয় “হাবলের ধ্রুবক”। খেয়াল করুন, প্রতিটি বিন্দু দেখতে একই রকম, যেন মনে হচ্ছে প্রতিটি বিন্দুই সম্প্রসারণের একেকটি কেন্দ্র! সুতরাং এই প্রতিটি সম্প্রসারিত বিন্দুর কোনো “নির্দিষ্ট কেন্দ্রবিন্দু” বলে কিছু নেই। একইভাবে আমাদের চারপাশের গ্যালাক্সিগুলো আমাদের থেকে দূরে সরে যাওয়াতে মনে হতে পারে আমরা হয়তো মহাবিশ্বের কেন্দ্রে অবস্থান করছি, আদতে এটা একটি বিভ্রম, অন্য গ্যালাক্সি থেকে আমাদের গ্যালাক্সিকে পর্যবেক্ষণ করলেও একই ফলাফল আসবে, অর্থাৎ তখন সেই গ্যালাক্সিকেই আমাদের কাছে মহাবিশ্বের কেন্দ্র মনে হবে।

 

(বিখ্যাত বাংলাদেশী বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম এর The ultimate fate of the universe বইয়ের বাংলা নির্যাস।)