পাশাপাশি দুটি গ্যালাক্সি

মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি–১, এই যাত্রার শেষ কোথায়?

মেঠোপথ ছেড়ে হাইওয়েতে উঠে এলো এক নিঃসঙ্গ মুসাফির। দুদিকের প্রান্তহীন সড়ক যেন দিগন্তে গিয়ে মিশেছে। মুসাফিরের ক্লান্ত শ্রান্ত চোখে মুহূর্তেই মলিনতা ছাপিয়ে ফুটে উঠল বিস্ময়। হাঁটতে হবে বহুদূর। মুখ থেকে আপনা-আপনি বেরিয়ে এলো স্বগতোক্তি–এই যাত্রার শেষ কোথায়?

জগৎ চলছে আপনতালে, পৃথিবী ঘুরছে, সূর্য কিরণ দিচ্ছে, চাঁদ হাসছে। আর আমরা ভাবছি। আমাদের মস্তিস্কে আলোড়ন তুলছে আদিম বংশধরদের কাছ থেকে পরম্পরায় বয়ে আসা এক অদ্ভুত কার্যকরী বৈশিষ্ট্য : কৌতুহল। এই কৌতূহলের বদান্যতায় জীবনের কোনো না কোনো বাঁকে পৌঁছে আমরাও আপনমনে স্বগতোক্তি করে উঠি–এই যাত্রার শেষ কোথায়?

মানবজাতির উদ্ভাবিত সবচেয়ে উপকারী, সবচেয়ে নিখুঁত, সবচেয়ে বিশ্বস্ত হাতিয়ারের নাম হচ্ছে বিজ্ঞান। যার বিপুল অবদানে আমরা মোহিত, চকিত, আর সমৃদ্ধ। তো, বিজ্ঞানকে যদি প্রশ্ন করি : এই যাত্রার শেষ কোথায়? বিজ্ঞান কি পারবে সঠিক উত্তর দিতে? দেখা যাক…

: বিজ্ঞান, এই যাত্রার শেষ কোথায়?

: কোন যাত্রার?

: মানে আমাদের অন্তিম পরিণতি কী?

: তার আগে আপনি ক্লিয়ার করুন, এই ‘আমাদের’ বলতে আপনি কাদের বোঝাচ্ছেন? শুধুই মনুষ্যসম্প্রদায়? পৃথিবী? নাকি এই পুরো মহাবিশ্বটাই?

: আচ্ছা ধরো আমি পুরো মহাবিশ্বটাকেই বোঝাচ্ছি!

: তাহলে এটা খুব সুন্দর প্রশ্ন, কিন্তু উত্তরটা প্রশ্নের মতো এত সহজ না!

: কেন?

: কারণ, মহাবিশ্ব সম্পর্কে এখনো অনেক কিছুই আমরা জানিনা, কোনোকিছুর পরিণতি সম্পর্কে জানতে হলে এর উদ্ভব এবং বর্তমান প্রসেস সম্পর্কে জানতে হয়।

: ওহ আচ্ছা। আমরা কি তাহলে মহাবিশ্বের পরিণতি জানি না? যেহেতু মহাবিশ্বের পরিণতির ওপর আমাদের পরিণতিও নির্ভর করে। তাই এটা না জানাটা খুবই হতাশাজনক।

: হতাশ হবেন না, বিজ্ঞান কখনো থেমে থাকে না, অনবরত চেষ্টা চালিয়ে যায়। আমরা মহাবিশ্বের যতটুকু জানি তার ওপর ভিত্তি করেই মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতির কিছু মডেল তৈরি করেছি। এবং মডেলগুলো বেশ গ্রহণযোগ্যও বটে!

: তাই নাকি? তাহলে বলা যায় আমরা মহাবিশ্বের সম্ভাব্য পরিণতি জানি?

: হ্যাঁ অনেকটা সেরকমই। আধুনিক বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ দুটো শাখা হচ্ছে অ্যাস্ট্রোনমিকসমোলজি। বিগত কয়েক দশকে এই দুটো শাখা এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে আমরা এই দুইয়ের ওপর ভর করে মহাবিশ্বের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ দেখতে পাই!

: এটা শুনে খুব ইন্টারেস্ট পাচ্ছি, আমাকে কি বিস্তারিত খুলে বলা যাবে? একেবারে প্রথম থেকে?

: হ্যাঁ প্রথম থেকেই শুরু করছি। মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি জানতে হলে আগে এর গঠনপ্রকৃতি এবং কীভাবে মহাবিশ্ব এই অবস্থায় এসে পৌঁছেছে সেটা জানতে হবে। সংক্ষেপে বলি তাহলে?

: হুম।

: মহাবিশ্বের মৌলিক অংশ হিসেবে, আমরা যদি বিশাল পরিসর থেকে চিন্তা করি, তাহলে প্রথমেই চলে আসে গ্যালাক্সিগুলোর কথা। একেকটা গ্যালাক্সি যেন নক্ষত্রে ঠাসা জ্বলজ্বলে দ্বীপ। যেন নিকষ মহাশূন্যের বিশাল বুক চিরে মাথা তুলে জেগে আছে। একেকটি সাধারণ গ্যালাক্সিতে গ্র‍্যাভিটির বন্ধনে যুক্ত প্রায় ১০০ বিলিয়ন নক্ষত্র বসবাস করে। আমরাও এরকম একটি গ্যালাক্সির বাসিন্দা, সূর্য হলো এই গ্যালাক্সির একশ বিলিয়ন নক্ষত্রের মাঝে মধ্যবিত্ত এক নক্ষত্র। এই সূর্যের চারপাশে আমাদের পৃথিবী ছাড়াও আরও আটটি গ্রহ চক্কর দিচ্ছে, যাকে সৌরজগৎ বলে। আর আমাদের এই গ্যালাক্সির আমরা নাম দিয়েছি ‘মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি’।

: ঠিক, এগুলো মোটামুটি জানতাম, কন্টিনিউ…

: তো, আমাদের জানা অজানা গ্যালাক্সিগুলো নিয়েই আমাদের এই মহাবিশ্ব। গ্যালাক্সিগুলো পুরো মহাবিশ্বে মোটামুটি সমানভাবে ছড়িয়ে আছে এবং দিন দিন এগুলোর মধ্যকার স্পেইস বড়ো হচ্ছে। এ থেকেই বোঝা যায় মহাবিশ্ব স্থির নয়, বরং ক্রমাগত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এই দূরে সরে যাওয়ার হারকে হিসেব কষে বিজ্ঞানীরা বলে দিয়েছেন–প্রায় ১৩.৭৭ বিলিয়ন বছর আগে মহাবিশ্বের প্রাথমিক উপাদানগুলো খুব ঘন এবং উচ্চ তাপমাত্রায় একসাথে এঁটে ছিল। তারপর যখন সময়ের সাথে সাথে স্পেইস বড়ো হয়, তখন বাড়তে থাকে উপাদানগুলির মধ্যকার দূরত্ব। এর অনেক পরে এসব পদার্থ জায়গায় জায়গায় ঘনীভূত হয়ে গঠিত হয় একেকটি গ্যালাক্সি। আর স্পেইসের এই সম্প্রসারণের সূচনাকে বলা হয় ‘বিগ ব্যাং’। নামে বিগ ব্যাং হলেও আদতে সেখানে কোনো বিস্ফোরণ হয়নি। স্পেইস প্রসারিত হয়েছে, উপাদানগুলো দূরে সরে গেছে, এটাই।

: আচ্ছা তার মানে মহাবিশ্ব প্রতিনিয়ত বড়ো হচ্ছে, এর কি কোনো শেষ নেই? এভাবে কি অনন্তকাল ধরে বড়ো হতেই থাকবে?

: আসলেই, মহাবিশ্বের এই সম্প্রসারণ কি চিরকাল অব্যাহত থাকবে? নাকি একপর্যায়ে থেমে গিয়ে আবার উলটো সংকুচিত হতে শুরু করবে? এটি কিন্তু কসমোলজির খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন, তবে দুঃখের বিষয় হলো, আমরা এখনো এর সঠিক উত্তর জানি না! তাই এখানে কয়েকটি মডেলের অবতারণা করা হয়েছে। আমি আপাতত দুটো মডেল নিয়েই বলি : যে মডেলে মহাবিশ্ব অনন্তকাল সম্প্রসারিত হতে থাকবে সেই মহাবিশ্বের মডেলকে “Open Universe” মডেল বলা হয়। এবং যে মডেলে মহাবিশ্ব সম্প্রসারণের শেষ পর্যায়ে গিয়ে আবার উলটো সংকুচিত হতে শুরু করবে সেই মহাবিশ্বের মডেলকে “Close Universe” মডেল বলা হয়। এখন কোটি টাকার প্রশ্ন হলো–আমরা কোন মডেলের মহাবিশ্বে আছি? উন্মুক্তটায়? নাকি বদ্ধটায়? এর উত্তরের ওপরই মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ভর করছে। তবে মহাবিশ্বটা উন্মুক্ত হবার ব্যাপারে কিছু ইঙ্গিত অবশ্যি পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এখনই চূড়ান্ত করে কিছু বলার সময় আসেনি। যাইহোক, চলুন উন্মুক্ত মহাবিশ্বের মডেলটা দেখে আসি :

Open universe model

ছবি: ওপেন ইউনিভার্স মডেল

মহাবিশ্বটা যদি উন্মুক্ত হয় তাহলে এর কপালে কী পরিণতি অপেক্ষা করছে? আগেই বলেছি, যেহেতু গ্যালাক্সিগুলোর সমষ্টিই মহাবিশ্ব, তাই আগে গ্যালাক্সির দিকে আলোকপাত করি, হাঁড়ির এক ভাত টিপলে খবর মিলবে বাকি সব ভাতের। ধরি একটি সাধারণ ছিমছাম গ্যালাক্সি, তার ভেতর অনেকগুলো নক্ষত্র। এই নক্ষত্রদের জন্ম-মৃত্যু আছে, নক্ষত্ররা সময়ের সাথে সাথে বিকশিত হয় আবার মারাও যায়। সময়ের পাল্লায় মাপলে একেকটা নক্ষত্রের জীবনকাল প্রায় ১০ বিলিয়ন বছর। ১০ বিলিয়ন বছর মানে হচ্ছে ১ হাজার কোটি বছর। একটা নক্ষত্র ১০ বিলিয়ন বছর পেরিয়ে যখন জীবন সায়াহ্নে এসে পৌঁছে, তখন তার ভাগ্যে তিন ক্যাটাগরির যে কোনো একটি পরিণতি অপেক্ষা করে। তার কপালে কী পরিণতি অপেক্ষা করছে সেটা নির্ভর করে নক্ষত্রের ভরের ওপর। তো, এই তিন ক্যাটাগরির যে কোনো একটিতে পরিণত হলে তাকে আমরা মৃত নক্ষত্র বলতে পারি। এই তিনটি ক্যাটাগরি হলো :

  • White dwarf (সাদা বামন)
  • Neutron star (নিউট্রন তারা)
  • Black hole (কৃষ্ণগহ্বর)

এই ক্যাটাগরিগুলো নিয়ে বিস্তারিত সামনে আলোচনা করব, এখন জাস্ট নোট করে রাখেন–এই মৃত নক্ষত্রগুলোর উপাদান অত্যন্ত চাপ এবং তাপে খুব ঘন অবস্থায় থাকে। সবচেয়ে ঘন উপাদান থাকে ব্ল্যাকহোলে। তো কমনসেন্স বলে, ভবিষ্যতে একটা গ্যালাক্সির সবগুলো নক্ষত্রের কপালে এই তিনটি ক্যাটাগরির যে কোনো একটা অপেক্ষা করছে।

ছবি: হোয়াইট ডোয়ার্ফ বা সাদা বামন

এভাবে একটা গ্যালাক্সির সবগুলো নক্ষত্র মারা যেতে ১০০ বিলিয়ন থেকে হাজার বিলিয়ন বছর বা আরও বেশি সময় লেগে যেতে পারে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, বর্তমান গ্যালাক্সিগুলো লক্ষকোটি বছর পর অগণিত মৃত নক্ষত্র দিয়ে ঠাসা থাকবে। যারা গ্র‍্যাভিটির পারষ্পরিক বন্ধনে আবদ্ধ থাকবে। এই নক্ষত্রদের কোনো উত্তাপ না থাকার কারণে পুরো গ্যালাক্সিজুড়ে তীব্র শীতল অবস্থা বিরাজ করবে। গ্র‍্যাভিটির আকর্ষণ তখনও গ্রহ উপগ্রহগুলোকে ধরে রাখবে। কিন্তু মহাবিশ্ব উন্মুক্ত হবার কারণে গ্যালাক্সিগুলোর মাঝের দূরত্ব ক্রমশ বাড়তেই থাকবে।

: তারপর? তারপর কী হবে?

: তারপর গ্যালাক্সিগুলোর গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন ঘটবে আরও অনেক বড়ো পরিসরে। অনেক বড়ো সময়জুড়ে। কিছু মৃত নক্ষত্র অন্য নক্ষত্রের সাথে প্রবলভাবে ধাক্কা খেয়ে গ্যালাক্সি থেকে বের হয়ে যাবে। বিলিয়ন বিলিয়ন বছর (10¹⁸, অর্থাৎ ১ এর পর ১৮ টা শূন্য!) বা বিলিয়ন বিলিয়ন বিলিয়ন বছরে (10²⁷) এভাবে একটা গ্যালাক্সি থেকে প্রায় ৯৯% নক্ষত্র বের হয়ে যেতে পারে। বাকি ১% মৃত নক্ষত্রগুলো একত্র হয়ে খুব ঘন একটি কোর গঠন করবে, যা একটি প্রচণ্ড ব্ল্যাকহোলে পরিণত হবে।

ছবি: কৃষ্ণগহ্বর(Black Whole)

এই ব্ল্যাকহোলের ভর হবে প্রায় এক বিলিয়ন সৌর ভরের সমান। আমরা এটাকে তখন ডাকব (যদি টিকে থাকি আর কী!) ‘গ্যালাক্টিক ব্ল্যাকহোল’। আর গ্যালাক্সির এই যে পরিবর্তনের কথা বলছি এটাকে বলে Dynamical evolution of galaxy বা “গ্যালাক্সির পরিবর্তন গতিবিদ্যা”।

ছবি: নিউট্রন তারকা

: ও মাই গড! মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে!

এখানেই শেষ নয়! আমি নক্ষত্রের তিনটি চূড়ান্ত পরিণতির কথা বলছিলাম না?, ধরেন একটি নক্ষত্র চূড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছে গেল, সুবিধার জন্য ধরে নিই সর্বগ্রাসী ব্ল্যাকহোলে রূপান্তরিত হলো। আগেই বলেছি এতেই প্রায় ১০ বিলিয়ন বছর লেগে যাবে। তো, ব্ল্যাকহোল কিন্তু বিকিরণের মাধ্যমে খুব ধীরে ধীরে তার ভর হারায়। তখন যদি আরও বিলিয়ন বিলিয়ন বছর অপেক্ষা করি, দেখা যাবে এই ব্ল্যাকহোলটিও বিকিরণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তার ভর হারাচ্ছে। এইভাবে প্রায় 10⁶⁵ বছরে সৌরভরের সমান একটি ব্ল্যাকহোল (সৌরভরের সমান নক্ষত্র কখনো ব্ল্যাকহোলে পরিণত হয় না, হিসেবের সুবিধার জন্য ধরা হয়েছে আরকি!) বিকিরণের মাধ্যমে ভর হারিয়ে পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে! পুরো গ্যালাক্সির সব নক্ষত্র গ্যালাক্টিক ব্ল্যাকহোলের পেটে গিয়ে আস্ত গ্যালাক্সিটা ব্ল্যাকহোলে পরিণত হতে যত সময় লাগবে, সৌরভরের সমান একটি ব্ল্যাকহোল বিকিরণ করে মিলিয়ে যেতে তারচেয়েও বেশি সময় লাগবে। কারণ ব্ল্যাকহোলের ভর যত কম, তার বিকিরণের পরিমাণও তত অল্প।

: আচ্ছা একবার যদি গ্যালাক্টিক ব্ল্যাকহোল তৈরি হয়ে যায়। তাহলে কী ঘটবে? এটা কি চিরস্থায়ী হবে?

: সুন্দর প্রশ্ন, এই প্রশ্নটা মনে উদয় হওয়া স্বাভাবিক। আসলে, এটারও ক্ষয় আছে! এই দানবীয় গ্যালাক্টিক ব্ল্যাকহোল পুরোপুরি ক্ষয় হতে প্রায় 10⁹⁰ বিলিয়ন বছর লাগবে।

: শেষ?

: নাহ, এত সহজে গল্প ফুরোচ্ছে না!

এরচেয়েও বড়ো পরিসর নিয়ে গঠিত হয় সুপারগ্যালাক্টিক ব্ল্যাকহোল। অনেকগুলো গ্যালাক্সি নিয়ে গঠিত হয় একেকটি গ্যালাক্সি ক্লাস্টার। আর এই গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের সবগুলো গ্যালাক্সিকে গ্রাস করে যে ব্ল্যাকহোল জন্ম নেয় সেটাকেই সুপারগ্যালাক্টিক ব্ল্যাকহোল বলে। সুপারগ্যালাক্টিক ব্ল্যাকহোল বিকিরণ করে পুরোপুরি ক্ষয় হতে সময় লাগে প্রায় 10¹⁰⁰ বছর। সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি 10¹⁰⁰ বছরে সব গ্যালাক্সি ক্লাস্টারগুলো সুপারগ্যালাক্টিক ব্ল্যাকহোলে পরিণত হয়ে যাবে। মহাবিশ্বে গ্যালাক্সি নামে আর কিছু থাকবে না। শুধু অবশিষ্ট থাকবে দিগ্বিদিক ছুটতে থাকা কতিপয় নিউট্রন তারা, সাদা বামন এবং অতীতে গ্যালাক্সি থেকে প্রবল সংঘর্ষে বেরিয়ে আসা ছোটোখাটো পদার্থের টুকরোগুলি। এই মৃত নক্ষত্র এবং পদার্থের টুকরোগুলো অনন্ত মহাবিশ্বে নিঃসঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়াবে।

: তারপর?

: তারপর আরও 10¹⁰⁰ সময়ের বিশাল ব্যাপ্তি নিয়ে এই মৃত নক্ষত্র এবং পদার্থগুলোতে খুব ধীরে ধীরে সুক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটবে। আসলে কী পরিণতি ঘটবে এগুলোর কপালে? এর উত্তর দিতে গিয়ে একটি বিষয় চলে আসে, আর সেটা হলো–এই পদার্থগুলোর স্থায়িত্বকাল আসলে কত সময়? যদিও এটা কেউই শিওর করে বলতে পারে না। তবুও এটার কয়েকটা সম্ভাবনা নিয়ে সামনে বিস্তারিত আলাপ করব। এখন শুধু একটা সম্ভাবনার কথা বলি-

কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কিছু সূত্র অনুযায়ী একটি সম্ভাবনা আছে এই মৃত নক্ষত্র এবং পদার্থগুলি শেষ পর্যন্ত ব্ল্যাকহোলেই ঠাঁই নিবে, এবং বিকিরণ করে শেষমেশ ক্ষয় হয়ে যাবে। সময়ের ব্যাপ্তিতে এটা ঘটতে 10*10⁷⁶ বছর লাগবে।

: এটা ঠিক কত বছর?

: আমি যদি ‘বিলিয়ন’ শব্দটা এক বিলিয়ন বার লিখি, তারপরও আমার লেখা সংখ্যাটা এই 10*10⁷⁶ এর তুলনায় কিছুই না! এবার ভাবতে থাকুন!

এবার আসি, একটি উন্মুক্ত মহাবিশ্বে সভ্যতা বা প্রাণ কতদিন টিকে থাকতে পারে? আসলে কোন টাইপের সভ্যতা বা প্রাণ দীর্ঘসময় ধরে টিকতে পারবে এটা ধারণা করা একেবারেই অসম্ভব। তবে সভ্যতা বা প্রাণের টিকে থাকাটা নির্ভর করে শক্তির উৎসের সহজলভ্যতার ওপর। যেমন আমরা টিকে আছি সৌরশক্তির ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, শক্তির উৎসের মেয়াদও কিন্তু ওই 10¹⁰⁰ বছর পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। তাই এই সময়ের পর মহাবিশ্বে প্রাণ থাকার ব্যাপারে কোনো আশা করা যায় না। তবে এগুলোর ব্যাপারে কিছু হাইপোথিসিস আছে, সেগুলো নিয়ে আরেকদিন বিস্তারিত আলোচনা করব।

Close universe model

ছবি: ক্লোজড ইউনিভার্স মডেল

তো মহাবিশ্বটা উন্মুক্ত হলে এতক্ষণ যা যা বললাম মোটামুটি তাই তা-ই ঘটবে। কিন্তু মহাবিশ্ব যদি বদ্ধ হয় তখন কী হতে পারে? এক্ষেত্রে মহাবিশ্ব তার প্রসারণের সর্বোচ্চ সীমায় গিয়ে থেমে যাবে। তখন গ্যালাক্সিগুলো বর্তমান সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ দূরত্বে অবস্থান করবে। গ্যালাক্সিগুলো ওই অবস্থায় ৪০ থেকে ৫০ বিলিয়ন বছর সময় স্থবির থাকতে পারে। তারপর এটি আবার সংকুচিত হতে শুরু করবে। ৯০-১১০ বিলিয়ন বছর পর মহাবিশ্বের ঘনত্ব ও তাপমাত্রা খুবই বেড়ে যাবে এবং শুরু হবে ‘বিগ ক্রাঞ্চ’ বা মহা-সংকোচন। মহাবিশ্বের সব পদার্থ উত্তপ্ত হয়ে একসাথে একাকার হয়ে যাবে। মহাবিশ্বের এই দশায় কোনোরূপ প্রাণ টিকে থাকার সম্ভাবনা নেই। এই বিগ ক্রাঞ্চের পর কী ঘটবে? সত্যিই কি তখন ‘এরপর’ বলতে কিছু থাকবে? মহাবিশ্বের এক কোনার সাধারণ একটা গ্যালাক্সির মধ্যবিত্ত এক নক্ষত্রের চারপাশে অবিরাম ছুটে চলা ছোট্ট একটা গ্রহের বাসিন্দা হয়ে আমরা সেটা জানি না। কিন্তু তাতে কী? যতটুকু জানি সেটাই বা কম কীসে?

: প্রচণ্ড ইমোশনাল হয়ে গেলাম! কাঠখোট্টা বিজ্ঞান শুনে এত আবেগতাড়িত হবো ভাবতেই পারিনি!

: পুরো বিষয়টা শুনার জন্য ধন্যবাদ।

(আমি এখানে মহাবিশ্বের স্ট্যান্ডার্ড মডেলের ওপর ভিত্তি করে আলোচনা করেছি, এছাড়াও মহাবিশ্বের আরও অনেক মডেল রয়েছে। কিন্তু এটাই এখন পর্যন্ত সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য।)

প্রয়াত নন্দিত বাংলাদেশী বিজ্ঞানী স্যার জামাল নজরুল ইসলামের (১৯৩৯-২০১৩) “The ultimate fate of the universe” অবলম্বনে।

পরবর্তী পর্ব পড়তে পারেন – মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি–২, মহাবিশ্ব মাপার ফিতে

3 thoughts on “মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি–১, এই যাত্রার শেষ কোথায়?”

  1. দারুণ হয়েছে ভাই। খুবই সহজ প্রাঞ্জল ভাষায় বুঝিয়েছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *