মহাবিশ্ব, এই যাত্রার শেষ কোথায়?

মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি (১ম পর্ব)
মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি (১ম পর্ব)
  1. মহাবিশ্ব, এই যাত্রার শেষ কোথায়?
  2. মহাবিশ্ব মাপার ফিতে
  3. মিল্কিওয়ে: আমাদের নক্ষত্রবাড়ি
  4. অন্যান্য গ্যালাক্সিরা
  5. মহাবিশ্বের মহাবিন্যাস
  6. মহাবিশ্বের মহাপ্রসারণ এবং তরঙ্গ কথন
  7. রেড শিফট এবং ডপলার ইফেক্ট
  8. অলবার্সের প্যারাডক্স
  9. মহাবিশ্বের নানা মডেল
  10. মহাবিশ্বের গাণিতিক প্রকৃতি
  11. মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ

মহাবিশ্বের শেষ পরিণতি কী? কী চিত্রনাট্যই বা অপেক্ষা করছে পৃথিবী ও মানবজাতির শেষ ভাগ্যে? এই প্রশ্নগুলো আদিকাল থেকেই মানুষকে কোনো না কোনোভাবে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। বিজ্ঞানের উন্নতির এই পর্যায়ে এসে আমরা এর একটা সন্তোষজনক উত্তর বের করে নিতে পারি।

আধুনিক বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ দুটো শাখা হচ্ছে অ্যাস্ট্রোনমি ও কসমোলজি। বিগত কয়েক দশকে এই দুটো শাখা এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে আমরা এই দুইয়ের ওপর ভর করে মহাবিশ্বের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ দেখতে পাই! আজকে আমরা পর্যবেক্ষণ থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও সুনির্দিষ্ট অনুমানের ভিত্তিতে এই প্রশ্নগুলোর যুৎসই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব। কোনোকিছুর পরিণতি সম্পর্কে জানতে হলে এর উদ্ভব এবং বর্তমান প্রসেস সম্পর্কে জানতে হয়। তাই মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি সম্পর্কে জানতে হলে আগে এর গঠনপ্রকৃতি সম্পর্কে জানতে হবে। কীভাবে মহাবিশ্ব এই অবস্থায় এসে পৌঁছেছে সেটাও অনুধাবন করতে হবে। শুরু করি তাহলে:

 

মহাবিশ্বের মৌলিক অংশ হিসেবে, আমরা যদি বিশাল পরিসর থেকে চিন্তা করি, তাহলে প্রথমেই চলে আসে গ্যালাক্সিগুলোর কথা। একেকটা গ্যালাক্সি যেন অনন্ত নক্ষত্রে ঠাসা জ্বলজ্বলে দ্বীপ। যেন নিকষ নিঃসীম মহাশূন্যের বিশাল বুক চিরে মাথা তুলে জেগে আছে। একেকটি সাধারণ গ্যালাক্সিতে গ্র‍্যাভিটির বন্ধনে যুক্ত প্রায় ১০০ বিলিয়ন নক্ষত্র বসবাস করে।

আমরাও এরকম একটি গ্যালাক্সির বাসিন্দা, সূর্য হলো এই গ্যালাক্সির একশ বিলিয়ন নক্ষত্রের মাঝে মধ্যবিত্ত এক নক্ষত্র। এই সূর্যের চারপাশে আমাদের পৃথিবী ছাড়াও আরও আটটি গ্রহ চক্কর দিচ্ছে, যাকে সৌরজগৎ বলে। আর আমাদের এই গ্যালাক্সিকে আমরা বলি ‘গ্যালাক্সি’ বা ‘মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি’।

 

এটি হাবল স্পেইস টেলিস্কোপ দিয়ে লং এক্সপোজারে তোলা বিশাল গ্যালাক্সি ক্লাস্টার Abell 2744 এর ছবি, ক্লাস্টারটিতে কয়েকশত গ্যালাক্সি রয়েছে যার কোনো কোনোটা আবার ৩.৫ বিলিয়ন বছর পুরোনো
ক্রেডিট: NASA, ESA, and J. Lotz, M. Mountain, A. Koekemoer, এবং HFF Team (STScI)

তো, আমাদের জানা-অজানা গ্যালাক্সিগুলো নিয়েই এই মহাবিশ্ব, তাই গ্যালাক্সিগুলোকে আমরা মহাবিশ্বের সমষ্টি হিসেবে উল্লেখ করতে পারি। কিছু তথ্য প্রমাণ অনুযায়ী, গ্যালাক্সিগুলো পুরো মহাবিশ্বে সুষমভাবে ছড়িয়ে আছে। পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, দিন দিন গ্যালাক্সিগুলো একটার থেকে অন্যটা দূরে সরছে, এ থেকে বোঝা যায় মহাবিশ্ব স্থির নয়, বরং ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে।

গ্যালাক্সিগুলোর এই দূরে সরে যাওয়াটাকে মহাবিশ্বের প্রসারণ বলা হয়।

 

গ্যালাক্সির এই দূরে সরে যাওয়ার হারকে হিসেব কষে বের করা হয়েছে–প্রায় ১৩.৭৭ বিলিয়ন বছর।  আগে মহাবিশ্বের প্রাথমিক উপাদানগুলো খুব ঘন এবং উচ্চ তাপমাত্রায় একসাথে এঁটে ছিল। সাধারণত ধারণা করা হয় তখন একটি সর্বব্যাপী বিস্ফোরণ ঘটে, এবং প্রাথমিক উপাদানগুলো দ্রুতবেগে দিগ্বিদিক ছড়িয়ে পড়ে। পরে এগুলো গুচ্ছ আকারে জায়গায় জায়গায় জড়ো হয় এবং বর্তমান গ্যালাক্সিগুলো গঠন করে। বিস্ফোরণের ফলে যে প্রসারণের সূচনা হয়েছিল, সেটার কারণেই আজতক গ্যালাক্সিরা পরষ্পর থেকে দূরে সরছে। আর এই সর্বব্যাপী বিস্ফোরণকেই বলা হয় “বিগ ব্যাং”।

 

মহাবিশ্বের এই সম্প্রসারণ কি চিরকাল অব্যাহত থাকবে? নাকি একপর্যায়ে থেমে গিয়ে আবার উলটো সংকুচিত হতে শুরু করবে? এটি কসমোলজির খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন, এই প্রশ্নটির উত্তরে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের কয়েকটি মডেলের অবতারণা করেছেন। আমি আপাতত দুটো মডেল নিয়েই বলি :

 

যে মডেলে মহাবিশ্ব অনন্তকাল সম্প্রসারিত হতে থাকবে সেই মহাবিশ্বের মডেলকে “Open Universe Model” বলা হয়। এবং যে মডেলে মহাবিশ্ব সম্প্রসারণের শেষ পর্যায়ে গিয়ে আবার উলটো সংকুচিত হতে শুরু করবে সেই মহাবিশ্বের মডেলকে “Close Universe Model” বলা হয়।

এখন কোটি টাকার প্রশ্ন হলো–আমরা কোন মডেলের মহাবিশ্বে আছি? উন্মুক্তটায়? নাকি বদ্ধটায়? এর উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি। মহাবিশ্বটা উন্মুক্ত হবার ব্যাপারে কিছু ইঙ্গিত অবশ্যি পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু এখনই চূড়ান্ত করে কিছু বলার সময় আসেনি। যাহোক, চলুন আগে উন্মুক্ত মহাবিশ্বের মডেলটা দেখে আসি :

 

 

ওপেন ইউনিভার্স মডেল ক্রেডিট: Mark Garlick / Science Photo Library

 

মহাবিশ্বটা যদি উন্মুক্ত হয় তাহলে এর কপালে কী পরিণতি অপেক্ষা করছে? আগেই বলেছি, যেহেতু গ্যালাক্সিগুলোর সমষ্টিই মহাবিশ্ব, তাই আগে দেখে নিই একটি উন্মুক্ত মহাবিশ্বের গ্যালাক্সিতে লম্বা সময় ধরে কী কী ঘটতে পারে, হাঁড়ির এক ভাত টিপলেই খবর মিলবে বাকি সব ভাতের। তো, ধরি একটি সাধারণ ছিমছাম গ্যালাক্সি, তার ভেতর অনেকগুলো নক্ষত্র। এই নক্ষত্ররা সময়ের সাথে সাথে বিকশিত হয় আবার মারাও যায়। মৃত্যু, অর্থাৎ চূড়ান্ত পরিণতি বরণ করার আগ পর্যন্ত একটি নক্ষত্রের ভেতর খুব অল্পস্বল্পই পরিবর্তন ঘটে। সময়ের পাল্লায় মাপলে একেকটা নক্ষত্রের জীবনকাল প্রায় ১০ বিলিয়ন বছর বা ১ হাজার কোটি বছর। একটা নক্ষত্র প্রায় ১০ বিলিয়ন বছর পেরিয়ে যখন জীবন সায়াহ্নে এসে পৌঁছায়, তখন তার ভাগ্যে তিন ধরনের যে কোনো একটি পরিণতি অপেক্ষা করে। তার কপালে কী পরিণতি অপেক্ষা করছে সেটা নির্ভর করে সেই নক্ষত্রের ভর, ব্যাস ইত্যাদির ওপর। তো, একটা নক্ষত্র এই তিন ধরনের যে কোনো একটিতে পরিণত হলে তাকে আমরা মৃত নক্ষত্র বলতে পারি। এই তিনটি ধরন হলো :

  • White dwarf (সাদা বামন)
  • Neutron star (নিউট্রন তারা)
  • Black hole (কৃষ্ণগহ্বর)

এই পরিণতিগুলো নিয়ে বিস্তারিত সামনে আলোচনা করব, এখন শুধু জেনে রাখি–এই মৃত নক্ষত্রগুলোর উপাদান অত্যন্ত চাপ এবং তাপে খুব ঘন অবস্থায় থাকে। সবচেয়ে ঘন উপাদান থাকে ব্ল্যাকহোলে। তো, কমনসেন্স বলে, ভবিষ্যতে সবগুলো নক্ষত্রের কপালে এই তিনটি পরিণতির যে কোনো একটা অপেক্ষা করছে।

এভাবে একটা গ্যালাক্সির সবগুলো নক্ষত্র মারা যেতে ১০০ বিলিয়ন থেকে হাজার বিলিয়ন বছর বা আরও বেশি সময় লেগে যেতে পারে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, বর্তমান গ্যালাক্সিগুলো লক্ষকোটি বছর পর মৃত নক্ষত্র এবং আন্তঃজাগতিক পদার্থের শীতল টুকরো দিয়ে গঠিত অগণিত গ্রহ, উপগ্রহ, গ্রহাণু, ইত্যাদি দিয়ে ঠাসা থাকবে। যারা গ্র‍্যাভিটির পারষ্পরিক বন্ধনে আবদ্ধ থাকবে ঠিকই, কিন্তু গ্যালাক্সিগুলো একে অন্যের থেকে বর্তমানের তুলনায় আরও বিশাল দূরে সরে যাবে।

তারপর গ্যালাক্সিগুলোর ভেতর কিছু পরিবর্তন ঘটবে আরও অনেক বড়ো পরিসরে, অনেক বিশাল সময়জুড়ে। কিছু মৃত নক্ষত্র অন্য নক্ষত্রের সাথে প্রবলভাবে ধাক্কা খেয়ে গ্যালাক্সি থেকে বের হয়ে যাবে। বিলিয়ন বিলিয়ন বছর (10¹⁸, অর্থাৎ ১ এর পর ১৮ টা শূন্য!) বা বিলিয়ন বিলিয়ন বিলিয়ন বছরে (10²⁷) এভাবে একটা গ্যালাক্সি থেকে প্রায় ৯৯% নক্ষত্র বের হয়ে যাবে। বাকি ১% মৃত নক্ষত্রগুলো একত্র হয়ে খুব ঘন একটি কোর গঠন করবে, যা একটি প্রচণ্ড ব্ল্যাকহোলের রূপ নেবে। এই ব্ল্যাকহোলের ভর হবে প্রায় এক বিলিয়ন সৌর ভরের সমান। আমরা এটাকে তখন ডাকব (যদি টিকে থাকি আরকি!) ‘গ্যালাক্টিক ব্ল্যাকহোল’। এই বিষয়ে সামনে আরও বিস্তারিত আলোচনা করব।

একজন শিল্পীর আঁকা Cygnus X-1 নামে একটি কৃষ্ণগহ্বরের (Black hole) চিত্র। ক্রেডিট: NASA/CXC/M.Weiss

প্রথম পর্বে নক্ষত্রদের যে তিনটি পরিণতির কথা বলেছি সেটা ঘটতে অন্তত ১০ বিলিয়ন বছর লাগবে, তার আগ পর্যন্ত একটি নক্ষত্রে খুব কমই পরিবর্তন ঘটে। তো, একটা নক্ষত্র যখন ব্ল্যাকহোলে পরিণত হয়, তখন থেকে নিয়মিত বিকিরণের মাধ্যমে খুব ধীরে ধীরে তার ভর হারায়। এইভাবে প্রায় 10⁶⁵ বছরে সৌরভরের সমান একটি ব্ল্যাকহোল (সৌরভরের সমান নক্ষত্র কখনো ব্ল্যাকহোলে পরিণত হয় না, হিসেবের সুবিধার জন্য ধরা হয়েছে আরকি!) বিকিরণের মাধ্যমে ভর হারিয়ে পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে! পুরো গ্যালাক্সিটা একটি গ্যালাক্টিক ব্ল্যাকহোলে পরিণত হতে যত সময় লাগবে, সৌরভরের সমান একটি ব্ল্যাকহোল বিকিরণ করে মিলিয়ে যেতে তারচেয়েও বেশি সময় লাগবে। কারণ ব্ল্যাকহোলের ভর যত কম, তার বিকিরণের পরিমাণও তত অল্প। তাই, একবার যদি গ্যালাক্টিক ব্ল্যাকহোল তৈরি হয়েও যায়, তাহলেও এই দানবীয় গ্যালাক্টিক ব্ল্যাকহোল পুরোপুরি ক্ষয় হতে প্রায় 10⁹⁰ বিলিয়ন বছর লাগবে।

এরচেয়েও বড়ো পরিসর নিয়ে গঠিত হয় সুপারগ্যালাক্টিক ব্ল্যাকহোল। অনেকগুলো গ্যালাক্সি নিয়ে গঠিত হয় একেকটি গ্যালাক্সি ক্লাস্টার। আর এই গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের সবগুলো গ্যালাক্সিকে গ্রাস করে যে ব্ল্যাকহোল জন্ম নেয় সেটাকেই সুপারগ্যালাক্টিক ব্ল্যাকহোল বলে। সুপারগ্যালাক্টিক ব্ল্যাকহোল বিকিরণ করে পুরোপুরি ক্ষয় হতে সময় লাগে প্রায় 10¹⁰⁰ বছর। সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি 10¹⁰⁰ বছরে সব গ্যালাক্সি ক্লাস্টারগুলো সুপারগ্যালাক্টিক ব্ল্যাকহোলে পরিণত হয়ে যাবে। মহাবিশ্বে গ্যালাক্সি নামে আর কিছু থাকবে না। শুধু অবশিষ্ট থাকবে দিগ্বিদিক ছুটতে থাকা কিছু নিউট্রন নক্ষত্র, সাদা বামন এবং অতীতে গ্যালাক্সি থেকে প্রবল সংঘর্ষে বেরিয়ে আসা আন্তঃজাগতিক পদার্থের টুকরো। এই মৃত নক্ষত্র এবং পদার্থের টুকরোগুলো অনন্ত মহাবিশ্বে নিঃসঙ্গ ভূত হয়ে ঘুরে বেড়াবে।

 

কল্পনায় সুপারগ্যালাক্টিক ব্ল্যাকহোল
ক্রেডিট: NOIRLAB/NSF/AURA/J. DA SILVA

তারপর আরও 10¹⁰⁰ সময়ের বিশাল ব্যাপ্তি নিয়ে এই মৃত নক্ষত্র এবং পদার্থগুলোতে খুব ধীরে ধীরে সুক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটবে। আসলে কী পরিণতি ঘটবে এগুলোর কপালে? এর উত্তর খুঁজতে গেলে আরেকটি প্রশ্ন চলে আসে–পদার্থের স্থায়িত্বকাল আসলে কত সময়? যদিও এটা কেউই শিওর করে বলতে পারে না। তবে এটার কিছু হাইপোথিসিস আছে, এরকম কয়েকটা হাইপোথিসিস নিয়ে সামনে বিস্তারিত আলাপ করব। এখন শুধু একটা হাইপোথিসিস বলি-

কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কিছু সূত্র অনুযায়ী একটি সম্ভাবনা আছে এই মৃত নক্ষত্র এবং পদার্থগুলি শেষ পর্যন্ত ব্ল্যাকহোলেই ঠাঁই নিবে, এবং বিকিরণ করে শেষমেশ ক্ষয় হয়ে যাবে। সময়ের ব্যাপ্তিতে এটা ঘটতে 10*10⁷⁶ বছর লাগবে।

এটা ঠিক কত বছর? আমি যদি ‘বিলিয়ন’ শব্দটা এক বিলিয়ন বার লিখি, তারপরও এটা 10*10⁷⁶ সংখ্যাটির তুলনায় কিছুই না! আশা করি বোঝাতে পারিনি!

এবার আসি, একটি উন্মুক্ত মহাবিশ্বে সভ্যতা বা প্রাণ কতদিন টিকে থাকতে পারে? আসলে কোন টাইপের সভ্যতা বা প্রাণ দীর্ঘসময় ধরে টিকতে পারবে এটা ধারণা করা একেবারেই অসম্ভব। তবে সভ্যতা বা প্রাণের টিকে থাকাটা নির্ভর করে শক্তির উৎসের সহজলভ্যতার ওপর। যেমন আমরা টিকে আছি সৌরশক্তির ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, শক্তির উৎসের মেয়াদও কিন্তু ওই 10¹⁰⁰ বছর পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। তাই এই সময়ের পর মহাবিশ্বে প্রাণ থাকার ব্যাপারে কোনো আশা করা যায় না। তবে কিছু হাইপোথিসিস অবশ্যি আছে, সেগুলো পরবর্তীতে আলোচনার জন্য রেখে দিয়েছি।

তো মহাবিশ্বটা উন্মুক্ত হলে এতক্ষণ যা যা বললাম মোটামুটি তাই তা-ই ঘটবে। কিন্তু মহাবিশ্ব যদি বদ্ধ হয় তখন কী হতে পারে? এক্ষেত্রে মহাবিশ্ব তার প্রসারণের সর্বোচ্চ সীমায় গিয়ে থেমে যাবে। তখন গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যেকার দূরত্ব হবে বর্তমান সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ। গ্যালাক্সিগুলো ওই অবস্থায় ৪০ থেকে ৫০ বিলিয়ন বছর স্থির থাকবে। এভাবে ৯০-১১০ বিলিয়ন বছর পর মহাবিশ্বের ঘনত্ব ও তাপমাত্রা খুবই বেড়ে যাবে এবং শুরু হবে ‘বিগ ক্রাঞ্চ’ বা মহা-সংকোচন। মহাবিশ্ব তখন উলটো সংকুচিত হতে শুরু করবে, ক্রমে সব পদার্থ উত্তপ্ত হয়ে একসাথে মিশে যাবে। মহাবিশ্বের এই দশায় কোনোরূপ প্রাণ টিকে থাকার সম্ভাবনাই নেই। এই বিগ ক্রাঞ্চের পর কী ঘটবে? সত্যিই কি তখন ‘এরপর’ বলতে কিছু থাকবে? মহাবিশ্বের এক কোনার সাধারণ একটা গ্যালাক্সির মধ্যবিত্ত এক নক্ষত্রের চারপাশে অবিরাম ছুটে চলা ছোট্ট একটা গ্রহের বাসিন্দা হয়ে আমরা সেটা জানি না। কিন্তু তাতে কী? যতটুকু জানি সেটাও নেহাৎ কম কিছু নয়।

 

ক্রেডিট: HOWSTUFFWORKS

সবশেষে কিছু কথা, কেন আমরা মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি নিয়ে মাথা ঘামাবো? প্রতুত্তরে যদি পাল্টা প্রশ্ন করি–কেন আমরা মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় আরোহন করতে চাই? উত্তর হবে একটাই–কৌতুহল! আমাদের মস্তিস্কে আলোড়ন তুলে চলেছে আদিম বংশধরদের কাছ থেকে পরম্পরায় বয়ে আসা এই অদ্ভুত কার্যকরী বৈশিষ্ট্যটি। তার ওপর, মহাবিশ্ব ও সভ্যতার অন্তিম পরিণতি একটি আকর্ষণীয় বিষয়, কারণ আমরা পরবর্তীতে দেখব এই বিষয়টি পদার্থবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান সহ বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় প্রশ্নের বান খুলে দেয়। তাই যদি আমরা মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি সম্পর্কে জানতে পারি, তাহলে বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখাগুলোও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠার যথেষ্ট খোরাক পাবে।

 

(বিখ্যাত বাংলাদেশী বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম এর The Ultimate Fate of The Universe বইয়ের বাংলা নির্যাস।)