মহাবিশ্ব মাপার ফিতে

মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি (২য় পর্ব)
মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি (২য় পর্ব)
  1. মহাবিশ্ব, এই যাত্রার শেষ কোথায়?
  2. মহাবিশ্ব মাপার ফিতে
  3. মিল্কিওয়ে: আমাদের নক্ষত্রবাড়ি
  4. অন্যান্য গ্যালাক্সিরা
  5. মহাবিশ্বের মহাবিন্যাস
  6. মহাবিশ্বের মহাপ্রসারণ এবং তরঙ্গ কথন
  7. রেড শিফট এবং ডপলার ইফেক্ট
  8. অলবার্সের প্যারাডক্স
  9. মহাবিশ্বের নানা মডেল
  10. মহাবিশ্বের গাণিতিক প্রকৃতি
  11. মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ

আপনি নিশ্চয়ই সিলেট থেকে ঢাকার দূরত্বটা ইঞ্চিতে মাপতে চাইবেন না। এই দূরত্ব মাপতে হলে আপনাকে কিলোমিটার বা মাইলে মাপতে হবে। কারণ পরিসর যত বেশি তার পরিমাপের একক তত বড়ো হতে হবে, তবেই মাপতে সুবিধে। জ্যোতির্বিদ্যার পরিসর আমাদের চেনাজানা পরিবেশ থেকে অনেক অনেক বড়ো। তাই এখানে সময় ও দূরত্বের বিশাল বিশাল একক ব্যবহার করা হয়। কিলোমিটার বা মাইলে নয়, এখানে দূরত্বের পরিমাপ হয় আরও বড়ো এককে। তো, প্রথমেই এমন কয়েকটি এককের সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিই :

আলোর গতিবেগ হচ্ছে সেকেন্ডে প্রায় ৩ লক্ষ কিলোমিটার। এই বিপুল গতিবেগ নিয়ে আলো ১ বছরে যতটুকু দূরত্ব পাড়ি দেয় সেটাকেই ১ আলোকবর্ষ বলে। কথা হচ্ছে আলো ১ বছরে ঠিক কতটা পথ পাড়ি দেয়? হিসেব করে দেখা গেছে আলো এক বছরে পাড়ি দেয় 9×10¹² কিলোমিটার বা নয় মিলিয়ন মিলিয়ন কিলোমিটার! এভাবে বললে অনেকেরই মাথায় ঢুকবে না, তাই একটু উদাহরণ দিয়ে বোঝাই :

পৃথিবীর পরিধি হচ্ছে প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার। তো, আলোকে পৃথিবীর চারপাশে চক্কর দিতে বললে সে ১ সেকেন্ডের মধ্যেই সাতবারের বেশি পৃথিবীকে চক্কর দিয়ে আসবে!

পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব প্রায় ৩ লক্ষ ৭১ হাজার কিলোমিটার, তার মানে আলো পৃথিবী থেকে চাঁদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলে পৌঁছুতে দেড় সেকেন্ডও লাগবে না!

পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্ব প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার। আলো এই দূরত্ব পাড়ি দিতে সময় নিবে মাত্র ৮ থেকে সাড়ে ৮ মিনিট!

পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্ব

সৌরজগতের দূরতম গ্রহ প্লুটো সূর্য থেকে প্রায় ৫৯০ কোটি কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। কিন্তু এই অভাবনীয় দূরত্বও পাড়ি দিতে আলোর লাগবে মাত্র সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা!

সূর্য থেকে প্লুটোর যে দূরত্ব, সেই দূরত্বকে ১৬০০ বার গুণ করলে যে বিশাল রাস্তা তৈরি হবে, সেই রাস্তাকেই এক আলোকবর্ষের দূরত্ব বলা যায়। আলোর এই দূরত্ব পাড়ি দিতে ১ বছর সময় লাগবে। এবার হয়তো কিছুটা বুঝতে পারছেন ১ আলোকবর্ষ মানে ঠিক কতটা দূরত্ব?

এখন কথা হচ্ছে, আমাদের সৌরজগতের ভেতরকার দূরত্বের হিসেব কষার ক্ষেত্রে আলোকবর্ষের এককটা ঠিক আদর্শ না, এরজন্য আলোকবর্ষের চাইতে ছোটো এককের দরকার। আপনি কি আপনার রুম থেকে ব্যালকনি কত দূরে সেটা কিলোমিটারে মাপবেন? ঠিক এই কারণে শুধু সৌরজগতের ভেতরকার দূরত্ব পরিমাপের জন্য আরেকটা ছোটো একক আছে। সেটাকে বলে ‘অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট’। সংক্ষেপে- AU.

পৃথিবী থেকে সূর্যের যে দূরত্ব সেই দূরত্বকে ১ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট ধরা হয়। সেই হিসেবে সূর্য থেকে সৌরজগতের সর্বশেষ গ্রহ (বামন গ্রহ) প্লুটোর দূরত্ব সাড়ে ৩৯ অ্যাস্টোনমিক্যাল ইউনিট। এবং প্রায় ৬০ হাজার অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিটে হয় ১ আলোকবর্ষ।

সূর্য থেকে সৌরজগতের বিভিন্ন গ্রহের দূরত্ব (অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিটে)

জ্যোতির্বিদরা প্রায়শই আলোকবর্ষের বদলে আরেকটি একক ব্যবহার করেন, যাকে ‘পারসেক’ বলা হয়। ১ পারসেক মানে ৩.২৬ আলোকবর্ষ। পারসেকের হিসেবটা কীভাবে আসে সংক্ষেপে বলি :

চোখের সামনে একটা আঙুল ধরুন, এবার প্রথমে ডান চোখ বন্ধ করে বাম চোখ দিয়ে আঙুলটাকে দেখুন। তারপর আবার বাম চোখ বন্ধ করে ডান চোখ দিয়ে আঙুলটাকে দেখুন। কী ঘটছে?

বাম চোখ বন্ধ করে তাকালে আঙুলটাকে একটু বামে সরতে দেখবেন। আবার ডান চোখ বন্ধ করে তাকালে আঙুলটাকে একটু ডানে সরতে দেখবেন। লক্ষ করবেন আঙুলটা চোখের কাছে নিয়ে এলে পেছনের ব্যাকগ্রাউন্ডের সাপেক্ষে আঙুলের ডানে-বায়ে সরে যাওয়া বেড়ে যাচ্ছে। এবং আঙুল দূরে নিলে সরে যাওয়াটাও কমে যাচ্ছে। দুটো চোখের সাপেক্ষে আঙুলের এই অবস্থান পরিবর্তনকে বলে কৌণিক বিচ্যুতি। এখানে দুটো চোখ হচ্ছে আলাদা দুটো ভিউপয়েন্ট, ভিউপয়েন্ট দুটোর মধ্যকার দূরত্ব যত বেশি হবে, কৌণিক বিচ্যুতি তত স্পষ্ট বোঝা যাবে। এভাবে কৌণিক বিচ্যুতি থেকে বস্তুর দূরত্ব পরিমাপ করাকে প্যারালাক্স বলা হয়।

পৃথিবী সূর্যের চারপাশে উপবৃত্তাকার কক্ষপথে ঘুরে, এটাকে পৃথিবীর বার্ষিক গতি বলে। আমরা আকাশের দিকে তাকালে পৃথিবীর কাছাকাছি কিছু নক্ষত্র দেখি, পৃথিবীর বার্ষিক গতির কারণে আমাদের কাছে মনে হয় যেন কাছাকাছি থাকা নক্ষত্রগুলো আকাশে একটি উপবৃত্তাকার কক্ষপথ ধরে ঘুরছে। সেই তুলনায় অনেক দূরে অবস্থিত নক্ষত্রগুলোর কৌণিক বিচ্যুতি আমাদের কাছে অনেক কম মনে হয়। কাছের বস্তু এবং দূরের বস্তুর এই কৌণিক বিচ্যুতির পার্থক্যকে আর্কসেকেন্ড দ্বারা প্রকাশ করা যায়, দুটো ভিউপয়েন্ট থেকে একটি নক্ষত্রকে পর্যবেক্ষণ করলে নক্ষত্রটির যদি ১ আর্কসেকেন্ড স্থানচ্যুতি ঘটে তাহলে ওই নক্ষত্রের দূরত্ব হচ্ছে ১ পারসেক। ২ সেকেন্ড কৌণিক বিচ্যুতি ঘটলে দূরত্ব হচ্ছে ০.৫ পারসেক। ৩৬০ ডিগ্রি মিলে হয় একটি বৃত্ত, ১ আর্কসেকেন্ড হলো ১ ডিগ্রির ৩৬০০ ভাগের মাত্র এক ভাগ। বোঝাই যাচ্ছে এটি খুবই ক্ষুদ্র একটি একক। প্যারালাক্স পদ্ধতি প্রয়োগ করে মোটামুটি ৬৫০ আলোকবর্ষের মধ্যকার যে কোনো বস্তুর দূরত্ব পরিমাপ করা যায়। ১ মিলিয়ন পারসেককে ১ মেগাপারসেক বলে। সূর্যের পর আমাদের সবচেয়ে কাছের স্টার সিস্টেম হলো আলফা সেন্টাউরি। এর কৌণিক বিচ্যুতি হলো বছরে ০.৭৫ আর্কসেকেন্ড। তার মানে হচ্ছে আলফা সেন্টুরি আমাদের থেকে ১.৩৩ পারসেক বা ৪.৩৪ আলোকবর্ষ দূরে রয়েছে।

প্যারালাক্সের সাহায্যে নক্ষত্রের দূরত্ব নির্ণয়

 

(বিখ্যাত বাংলাদেশী বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম এর The ultimate fate of the universe বইয়ের বাংলা নির্যাস।)