অলবার্সের প্যারাডক্স

মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি (৮ম পর্ব)
মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি (৮ম পর্ব)
  1. মহাবিশ্ব, এই যাত্রার শেষ কোথায়?
  2. মহাবিশ্ব মাপার ফিতে
  3. মিল্কিওয়ে: আমাদের নক্ষত্রবাড়ি
  4. অন্যান্য গ্যালাক্সিরা
  5. মহাবিশ্বের মহাবিন্যাস
  6. মহাবিশ্বের মহাপ্রসারণ এবং তরঙ্গ কথন
  7. রেড শিফট এবং ডপলার ইফেক্ট
  8. অলবার্সের প্যারাডক্স
  9. মহাবিশ্বের নানা মডেল
  10. মহাবিশ্বের গাণিতিক প্রকৃতি
  11. মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ

হ্যাঁ, এইবার মহাবিশ্বের “মডেল” নিয়ে আলোচনা করার উপযুক্ত সময় এসেছে। মহাবিশ্বের মডেল মানে হচ্ছে এমন একটি মহাবিশ্বের নমুনা যেখানে আমাদের জানা মহাবিশ্বের সব বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি কিছু যৌক্তিক অনুমানও থাকে, ভবিষ্যতে এইসব অনুমান অনেক রকম পরীক্ষার মাধ্যমে সত্যায়িত হলে তখন “মডেল”টা “থিয়োরি”ও হয়ে যেতে পারে। কোনো বস্তু বা প্রক্রিয়া সম্পর্কে অনুমাননির্ভর পরীক্ষা চালানোর জন্য এরকম মডেল বিজ্ঞানে হরহামেশাই ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেকগুলো হাইপোথিসিসের মধ্যে কোনটা বেশি যৌক্তিক সেটা পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষা করার জন্য এরকম মডেলের জুড়ি নেই। তাই, পর্যবেক্ষণলব্ধ বাস্তব পরীক্ষা-নিরীক্ষার পাশাপাশি মহাবিশ্বের যৌক্তিক অনুমান-নির্ভর মডেলও থাকা দরকার, কারণ আমরা এখনো পুরো মহাবিশ্বটাকে পরখ করতে পারি না।

যেসব মনীষীগণ মহাবিশ্বের মডেল নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছিলেন তাঁদের মধ্যে আইজ্যাক নিউটনের নাম (১৬৪২-১৭২৭) শুরুর দিকেই আসবে। তিনি খুব সাবলীলভাবে গতিবিদ্যার সূত্র এবং মহাকর্ষের সূত্র প্রদান করতে পেরেছিলেন কারণ তিনি তার কল্পনায় পুরো মহাবিশ্বের একটা সম্ভাব্য মডেল দাঁড় করিয়েছিলেন। উনার সূত্রগুলো দিয়ে গ্রহের গতিপথ খুব চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করা গিয়েছিল। তো, আরেক প্রথিতযশা রিচার্জ বেন্টলিকে (১৬৬২-১৭৪২) নিউটন চিঠিতে লিখেছিলেন–

“যদি কেবল পদার্থগুলো একটা অসীম মহাবিশ্বে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে যায়… তাহলে মহাকর্ষের টানে বিভিন্ন জায়গায় এগুলো গুচ্ছ আকারে জড়ো হবে, এভাবে প্রতিটি গুচ্ছের ভর বাড়বে, এবং সেই অসীম মহাবিশ্বে পদার্থগুলো একে অন্যের থেকে বিশাল দূরত্বে অবস্থান করবে। আর ঠিক এভাবেই আমাদের মহাবিশ্বে সূর্য ও অন্যান্য নক্ষত্রগুলো গঠিত হয়েছিল, এটি ছিল একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।”

নিউটন এটাও অনুমান করতে পেরেছিলেন–পদার্থগুলো যদি সমানভাবে একটি সসীম মহাবিশ্বে বিন্যস্ত হতো, তখন সমস্ত পদার্থ মহাকর্ষের টানে একসাথে জড়ো হয়ে যেত। তাঁর ভাষায়– “এবং সেটা একটি বিশাল ভরসম্পন্ন গোলকে রূপ নিত”।

যাহোক, নিউটনীয় গতিবিদ্যা এবং মহাকর্ষ পুরো মহাবিশ্বের তাত্ত্বিক কাঠামো বর্ণনা করার মতো যথেষ্ট ছিল না। নিউটন এবং তার উত্তরসূরীরা তখন পুরো মহাবিশ্বের বিন্যাস সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাননি এটাই এর একমাত্র কারণ নয়। তার ওপর উনারা মহাবিশ্ব সম্পর্কে এমন একটি ধারণা তৈরি করেছিলেন, যেখানে ধরে নিয়েছিলেন পুরো মহাবিশ্ব স্থির অবস্থায় আছে, এবং এতে বড়ো পরিসরে কোনো পরিবর্তন ঘটছে না, কিন্তু পরবর্তীতে এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। ইতিমধ্যেই আমরা দেখেছি, মহাবিশ্ব কোনো অনড় অবস্থানে নেই, বরং সম্প্রসারিত হচ্ছে। সামনে এ ব্যাপারে আমরা আরও স্পষ্ট হবো।

তারপর এলো জেনারেল রিলেটিভিটি, দেখা গেল, আলবার্ট আইনস্টাইনের এই থিয়োরিটা পুরো মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করার জন্য চমৎকার একটি গাণিতিক ও যৌক্তিক কাঠামো দাঁড় করায়। তবে ১৯৩৪ সালে ইংরেজ জ্যোতিঃপদার্থবিদ এডওয়ার্ড আর্থার মিলেন (১৮৯৬-১৯৫০) ডব্লু. এইচ ম্যাক্র‍্যার সহযোগিতায় দেখান, আইনস্টাইনের রিলেটিভিস্টিক কসমোলজির অনেক সিদ্ধান্ত নিউটনের ল থেকেও আসতে পারত, যা একটি সম্প্রসারিত মহাবিশ্বের ধারণা দেয়। সুতরাং স্থির মহাবিশ্বের ধারণাকে ছুঁড়ে ফেলার সুযোগ জেনারেল থিয়োরি অভ রিলেটিভিটি আসার আগেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল।

 

স্থির মহাবিশ্বের ধারণাকে বাতিল করার এরকম আরেকটি সুযোগ এসেছিল ১৮২৬ সালে, যখন জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী হেনরিখ অলবার্স একটি প্রশ্ন তোলেন, যা “অলবার্সের প্যারাডক্স” নামে পরিচিত। উনার প্রশ্ন ছিল, এই অসীম মহাবিশ্বটা যদি স্থিরই হবে তাহলে তো মহাকাশের প্রতিটি বিন্দু নক্ষত্র দিয়ে কানায় কানায় পূর্ণ থাকার কথা! একটু ভাবুন তো, অসীম স্পেইস, কিন্তু অনড় অটল মহাবিশ্ব! যার মধ্যে অসীম পরিমাণ নক্ষত্রেরা জেগে আছে, এমন দুনিয়ায় কখনো কি রাত হবে? হবে না, কিন্তু সেটাই হচ্ছে, কেন হচ্ছে? এই প্রশ্নটার উত্তর যদি তৎকালীন জ্যোতির্বিদরা একটু ভালো করে হাতড়াতেন, তাহলেই হয়তো আমরা জেনারেল থিয়োরি অভ রিলেটিভিটি আসার আগেই গতিশীল মহাবিশ্বের ধারণাটা পেয়ে যেতাম! আমাদের কসমোলজির অগ্রগতি হয়তো ত্বরান্বিত হতো আরও খানিকটা!

একটি স্থির মহাবিশ্বে অলবার্সের প্যারাডক্স অনুযায়ী রাতের আকাশ যেমন হতো।

আসলে কী বলেছিলেন হেনরিখ উইলহেলম ম্যাথাস অলবার্স? খুব সংক্ষেপে ও সোজাসাপ্টা বুঝিয়ে দিই…

রাত্রির অন্ধকার আকাশ! ধরে নিই মহাবিশ্বটি স্থির এবং অসীম, অর্থাৎ মোটাদাগে কোনো দুটি নক্ষত্রের মধ্যেকার দূরত্বে হেরফের হচ্ছে না। আরও ধরে নিই খুব বড়ো পরিসরে এই অসীম মহাবিশ্বের সবদিকেই নক্ষত্রদের গড় ঘনত্ব এবং গড় উজ্জ্বলতা একই রকম। আরও একটু ধরে নিই পুরো মহাবিশ্বটাই ইউক্লিডিয়ান, অর্থাৎ এই মহাবিশ্বের সবখানেই ইউক্লিডীয় জ্যামিতির রুলস মানা হয়। সবশেষে এটাও জেনে নিই–কোনো উৎস থেকে নির্গত আলোর তীব্রতা কিন্তু দূরত্বের বর্গের ব্যাস্তানুপাতে হ্রাস পায়। মানে হচ্ছে, উৎসের দূরত্ব দ্বিগুণ হলে তীব্রতা হ্রাস পায় “দুই দুকোনে চার” অর্থাৎ চার ভাগের এক ভাগ। উৎসের দূরত্ব তিনগুণ হলে তীব্রতা হ্রাস পায় “তিন তিরিকে নয়” অর্থাৎ নয় ভাগের এক ভাগ।

এবার আমরা পৃথিবীকে একটি পেয়াজের মাঝখানে ঢুকিয়ে দেবো, এখন এর চারপাশে অসংখ্যা খোসা, আই মিন লেয়ার! প্রথম লেয়ারের পরিধির চেয়ে দ্বিতীয় লেয়ারের পরিধি বড়ো, এভাবে ক্রমান্বয়ে একটার পরিধি অন্যটার চেয়ে বড়ো। ধরি একটা লেয়ার থেকে আরেক লেয়ারের দূরত্ব ১০০ আলোকবর্ষ। প্রত্যেক লেয়ারে নক্ষত্র আছে, লেয়ার যত বড়ো, লেয়ারে নক্ষত্রের পরিমাণ তত বেশি, লেয়ার অসীম পরিমাণ বড়ো হলে তাতে নক্ষত্রের পরিমাণও তো অসীম হবে, নাকি?

ধরি প্রথম লেয়ারে ১০০ নক্ষত্র আছে, অর্থাৎ পৃথিবী ১০০ টি নক্ষত্রের পূর্ণ আলো পাচ্ছে। দ্বিতীয় লেয়ার প্রথমটির চেয়ে বড়ো, তাই লেয়ারে নক্ষত্রের পরিমাণও বেশি, ধরি দ্বিতীয় লেয়ারে ৪০০ নক্ষত্র আছে। কিন্তু পৃথিবী থেকে দ্বিতীয় লেয়ারটির দূরত্ব প্রথম লেয়ারটির তুলনায় দ্বিগুণ, তাই পৃথিবীতে ওই লেয়ারের নক্ষত্রের ৪ ভাগের ১ ভাগ আলো পৌঁছাবে, অর্থাৎ ঘুরেফিরে সেই ১০০ নক্ষত্রের সমান উজ্জ্বলতা পৃথিবী পাবে। তার সাথে প্রথম লেয়ারের ১০০ যোগ করলে মোট উজ্জ্বলতা হবে ২০০। এভাবে হিসাব করলে দেখা যায়, প্রত্যেক লেয়ার থেকে একই সংখ্যক উজ্জ্বলতা পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে, একটি অসীম মহাবিশ্বে স্বভাবতই অসীম পরিমাণ লেয়ার থাকবে, অসীম পরিমাণ লেয়ার থেকে অসীম পরিমাণ আলো এসে পৃথিবীতে পৌঁছাবে, অসীম পরিমাণ আলোতে রাতের আকাশ অসীম পরিমাণ উজ্জ্বল হবে। রাতের আকাশের প্রতিটি পিক্সেল নক্ষত্রের আলোতে আলোকিত হয়ে ঝলমল করবে। এটাই কি হবার কথা নয়? কিন্তু বাস্তবে সেটা হচ্ছে কই?

অলবার্সের প্যারাডক্স অনুযায়ী পৃথিবীর চারপাশে কল্পিত লেয়ার।

কেন হচ্ছে না? হতে পারে নক্ষত্রদের আলো পৃথিবী অবদি আসার আগেই হয়তো অন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তু আলোটাকে শুষে নিচ্ছে! কিন্তু এভাবে যদি সব আলো মহাজাগতিক বস্তুরা শুষে নিত তাহলে এর ফলশ্রুতিতে মহাজাগতিক বস্তুগুলো চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠত। কেন্দ্রের বিন্দুতে, অর্থাৎ পৃথিবীতে বিকিরিত আলোর গড় ঘনত্ব একটা নক্ষত্রের পৃষ্ঠের সমান হয়ে যেত! পুরো পৃথিবী থাকত নক্ষত্রপৃষ্ঠের মতো গনগনে উত্তপ্ত। যাহোক, আলো শোষণ করার কারণটা সত্যি হলে সাথে এটাও ধরে নিতে হয় যে, এই মহাবিশ্ব অনাদি, যার কোনো শুরু ছিল না, যে কারণে অসীম পরিমাণ বিকিরণ অসীম পরিমাণ সময় এবং দূরত্ব পাড়ি দিয়ে আজ পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্নভাবে তাপের এই ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে! এই বিশ্লেষণ আমাদের আরও একটা সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়ে নিতো, তা হলো–অসীম সময় পাবার কারণে এই স্থির মহাবিশ্বের তাপগতিবিদ্যা এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে যে প্রতিটি নক্ষত্র যতটুকু আলো ও তাপ বিকিরণ করছে তার পুরোটাই শুষিতও হয়ে যাচ্ছে!

যাহোক, এমন কিছু ঘটছে না, এরকম বিশ্লেষণের সাথে পর্যবেক্ষণের ফলাফল মিলেনি। তার মানে বিশ্লেষণগুলোতে ভুল আছে, বেশিরভাগ বিশ্লেষণই ভুল প্রমাণিত হয়েছে। মহাবিশ্ব স্থির নয়, অনাদিও নয়, এর একটা শুরু আছে। অন্তত অলবার্স যেরকম সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন সেগুলোর একটাও সত্যি নয়। এই প্যারাডক্স থেকে সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের ধারণা বেরিয়ে আসতে গিয়েও আসেনি। “প্রসারমান এই মহাবিশ্বে দূরে সরতে থাকা গ্যালাক্সিগুলো থেকে লাল সরণ আকারে শক্তির বিকিরণ ঘটে, যার উজ্জ্বলতা দূরত্বের বর্গের ব্যাস্তানুপাতে কমতে থাকে। তাই রাতের আকাশকে আমরা কালো দেখি!”–এই চিন্তাটা কারও মাথায় উঁকি দেয়নি।

সবকিছুর পরও, তখন যদি অলবার্সের প্যারাডক্সটিকে গুরুত্বসহকারে নেওয়া হতো,  তাহলে এই প্যারাডক্সের ভিত্তিতে আরও প্রচুর হাইপোথিসিস গড়ে উঠত, সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের ধারণাও হয়তো হালে পানি পেত, তখন আর এডউইন হাবলের সম্প্রসারিত মহাবিশ্বের তত্ত্ব কারও কাছে উদ্ভট ঠেকত না।

 

(বিখ্যাত বাংলাদেশী বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম এর The ultimate fate of the universe বইয়ের বাংলা নির্যাস।)