মহাবিশ্বের গাণিতিক প্রকৃতি

মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি (১০ম পর্ব)
মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি (১০ম পর্ব)
  1. মহাবিশ্ব, এই যাত্রার শেষ কোথায়?
  2. মহাবিশ্ব মাপার ফিতে
  3. মিল্কিওয়ে: আমাদের নক্ষত্রবাড়ি
  4. অন্যান্য গ্যালাক্সিরা
  5. মহাবিশ্বের মহাবিন্যাস
  6. মহাবিশ্বের মহাপ্রসারণ এবং তরঙ্গ কথন
  7. রেড শিফট এবং ডপলার ইফেক্ট
  8. অলবার্সের প্যারাডক্স
  9. মহাবিশ্বের নানা মডেল
  10. মহাবিশ্বের গাণিতিক প্রকৃতি
  11. মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ
ছবির ক্রেডিট: NASA, ARCADE, এবং Roen Kelly.

মহাবিশ্ব বেলুনের মতো সমসত্ত্বভাবে ফুলে ওঠার উপমাটা আরও একবার টেনে আনি…

মনে করি বেলুনটির পৃষ্ঠে দুটো বিন্দু আছে, বিন্দু A এবং বিন্দু B. আরও মনে করি এই দুটো বিন্দু থেকে দুটো সরলরেখা বেলুনটির কেন্দ্র O তে গিয়ে মিলিত হয়েছে, অর্থাৎ AOB, এবার আমরা AOB কে ধরি θAB, এবং একে রেডিয়ান এককে পরিমাপ করি। এই θ এর উচ্চারণ হচ্ছে থিটা, থিটা গ্রিক বর্ণমালার অষ্টম বর্ণ, জ্যামিতিতে থিটা দিয়ে কোণ নির্দেশ করা হয়। তো, জ্যামিতির সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, বেলুনটির পৃষ্ঠ বরাবর A থেকে B এর যে দূরত্ব, এবং A ও B থেকে কেন্দ্রের যে দূরত্ব, যাকে আমরা θAB ধরেছি, এই θAB কে বেলুনটির ব্যাসার্ধের সাথে গুণ করলে একটি আদর্শ বৃত্ত পাওয়া যায় (আদর্শ বৃত্ত হচ্ছে সেই বৃত্ত যার কেন্দ্র থেকে পরিধি অবদি দূরত্ব সব দিক থেকে একই)। এবার মনে করি বেলুনটির ব্যাসার্ধ হচ্ছে R, বেলুনটি ফুলছে মানে ব্যাসার্ধ বড়ো হচ্ছে, তাহলে সময়ের সাথে যদি R এর মান পরিবর্তন হয়, তবে বিন্দু A এবং বিন্দু B এর মধ্যেকার দূরত্ব দাঁড়ায় θABR. অর্থাৎ বেলুনটি যতই ফুলে উঠুক, বিন্দু A এবং B থেকে বেলুনটির কেন্দ্রে যে কোণ উৎপন্ন হয়েছে সেটার মান একইরকম থাকছে। কারণ বেলুনটি ফুলে ওঠার সাথে সাথে A এবং B এর মধ্যেকার দূরত্ব বাড়লেও বেলুনটির কেন্দ্র থেকে A এবং B এর দিক সবসময় একই রকম থাকছে। এইভাবে বেলুনটির পৃষ্ঠের যেকোনো দুটো বিন্দুর মধ্যেও দূরত্বের আদল একইরকম থাকবে। অর্থাৎ–θCDR, যেখানে θCD হচ্ছে C ও D বিন্দু থেকে বেলুনটির কেন্দ্রে উৎপন্ন কোণ, যার মান সবসময়ই অপরিবর্তিত।

গোলকের পৃষ্টে অবস্থিত দুটো বিন্দু থেকে গোলকটির কেন্দ্র অবদি দুটো রেখা যুক্ত হয়ে একটি কোণ উৎপন্ন করেছে।

খুব সহজেই তো 3D বেলুনের 2D পৃষ্ঠ দিয়েই পুরো মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করে ফেললাম! ব্যাপারটা আদতে এত সহজ নয়। বেলুনের ডট 2D পৃষ্ঠে থাকলেও পুরো বেলুনের ভেতরটা কিন্তু 3Dই, অর্থাৎ ১ মাত্রা বেশি। এ থেকে অনেকেরই মনে হতে পারে আমাদের মহাবিশ্বের স্পেইস যেহেতু ত্রিমাত্রিক বা স্পেইস-টাইম সহ সেটা 4D তাহলে এরও বেলুনের মতো “ভেতরে” আরও ১ টা মাত্রা থাকতে পারে কি না, অর্থাৎ টোটাল মহাবিশ্বটা 5D কি না? আইনসটাইন তার মহাবিশ্বের মডেলে ঠিক এটাই করেছিলেন, সেই কল্পিত 5D এর জন্য জায়গা রেখেছিলেন। কিন্তু পরে এটা বাতিল হয়ে যায়। যার মানে মহাবিশ্ব স্পেইস এবং টাইম মিলে মোট ৪ মাত্রারই। এটাতে 5D বলে কিছু নেই। আমরা পরবর্তীতে দেখব মহাবিশ্বটি নন-ইউক্লিডিয়ান, এবং এতে আমাদের পরিচিত বস্তুর মতো কোনো “ভেতর” “বাহির” নেই।

পাঠকরা এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন দুটো নির্দিষ্ট বিন্দুর মধ্যে যেভাবে দূরত্ব বৃদ্ধি পায় ঠিক একই আদলে মহাবিশ্বের দুটো গ্যালাক্সির মধ্যেকার দূরত্বও বেড়ে চলে। আরও দেখা যায় বিন্দুগুলোর দূরত্ব বাড়ার গতি তাদের মধ্যেকার দূরত্বের সমানুপাতিক, ঠিক একইভাবে গ্যালাক্সিগুলোও হাবলের নীতি মেনে চলে। কেবল পার্থক্য হচ্ছে গ্যালাক্সিগুলোর ক্ষেত্রে হাবলের নীতি “প্রায়” নিখুঁত হিসাব দেয় (মহাকর্ষ ও গ্যালাক্সির নিজস্ব ঘুর্ণনবেগ এখানে প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করে), কিন্তু বেলুনের বিন্দুগুলোর ক্ষেত্রে এটি শতভাগ নিখুঁত হিসাব দেয়। বেলুনের বিন্দুগুলোর পরষ্পর দূরে সরে যাওয়ার হার থেকে এটাও প্রতীয়মান হয় যে, একটা নির্দিষ্ট সময়ে যদি A আর B বিন্দুর মধ্যেকার দূরত্ব দ্বিগুণ হয়, তবে যেকোনো দুটো নির্দিষ্ট বিন্দুর মধ্যেকার দূরত্বও সেই সময়ে দ্বিগুণ হয়ে যায়।

একটা নির্দিষ্ট সময়ে যদি A আর B বিন্দুর মধ্যেকার দূরত্ব দ্বিগুণ হয়, তবে যেকোনো দুটো নির্দিষ্ট বিন্দুর মধ্যেকার দূরত্বও সেই সময়ে দ্বিগুণ হয়ে যায়। ক্রেডিট: ScienceApologist

ফোলানো বেলুনের সাথে মহাবিশ্বের উপমাটা কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য ঠিক খাপে খাপ মিলে না, যেমন, বেলুনের ডটগুলো রয়েছে একটি 2D পৃষ্টে। এদিকে গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যেকার দূরত্ব বাড়ছে একটি 3D স্পেইসে (সময়ের মাত্রা বাদ দিয়ে)। আবার, মহাবিশ্বের স্পেইস বেলুনটির পৃষ্ঠের মতো বদ্ধ হবে কি না সেটাও এখনো বিতর্কিত। মহাবিশ্ব বদ্ধ হওয়ার মানে এই নয় যে গ্যালাক্সিগুলো একটা নির্দিষ্ট গণ্ডির ভেতরে রয়েছে যার বাইরে ‘স্পেইস’ বলতে কিছু নেই। বরং এর মানে হচ্ছে এই বদ্ধ মহাবিশ্বের সমস্ত স্পেইস জুড়ে গ্যালাক্সিগুলো সুষমভাবে ছড়িয়ে পড়ার ফলে স্পেইসটি নিজের ওপরই বদ্ধ হয়ে আছে, সেই সসীম মহাবিশ্বে আমরা যদি একটি “সরলরেখা” আঁকি, তাহলে এই “সরলরেখাটি” পুরো মহাবিশ্বকে প্রদক্ষিণ করে বিপরীত দিক বরাবর আবার একই পয়েন্টে ফিরে আসার কথা। তখন আমরা এই “সরলরেখাটির” মোট পরিধিকেই মহাবিশ্বের শেষ সীমানা ধরে নিতে পারতাম। কিন্তু আমরা চাইলেও গবেষণাগারে এরকম রিং বানিয়ে একটি সসীম মহাবিশ্বের মডেল তৈরি করতে পারব না। কারণ, গবেষণাগারে বানানো রিং ইউক্লিডিয়ান জ্যামিতির নিয়ম মানতে বাধ্য, যেখানে মহাবিশ্ব (বিশেষ করে মহাবিশ্বের সীমানা) নন-ইউক্লিডিয়ান।

লক্ষ্য করেছেন নিশ্চয়ই, আমি ওপরে “সরলরেখা” শব্দটিকে কোট করেছি, কারণ একটি নন-ইউক্লিডিয়ান মহাবিশ্বে সরলরেখা জিউডেসিক পথ অনুসরণ করবে এবং বিপরীত দিক থেকে আবার একই পয়েন্টে ফিরে আসবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়–একটি আদর্শ গোলকের পৃষ্ঠে আমরা যত চেষ্টাই করি না কেন সরলরেখা আঁকতে পারব না, রেখাটি গোলকের পৃষ্ঠের সাথে খাপ খাইয়ে চলতে গিয়ে বাঁকা হয়ে যাবে। যার ফলে মহাবিশ্বটা সসীম হলে এর কোনো প্রান্তসীমা থাকবে না, (উন্মুক্ত হলে তো আরও না)। এভাবে ভাবলে মহাবিশ্বটাকে একটি গোলকের সাথে তুলনা করা যায়, যেটা দুটো মাত্রায় আবদ্ধ কিন্তু এর কোনো প্রান্ত নেই। একটি সসীম মহাবিশ্বে পদার্থের পরিমাণও সসীম হতে হবে, কিন্তু মহাবিশ্বটা নিজেই যদি অসীম হয়? তার মানে আমাদের কাছে অসীম পরিমাণ পদার্থ আছে এই অসীম মহাবিশ্বকে পূর্ণ করার জন্য। আর ব্যাপারটা তাত্ত্বিকভাবেও সম্ভব। তবুও দেখা গেছে ব্যাপারটাকে অনুধাবন করতে গিয়ে অনেক সময় ঝানু বিশেষজ্ঞরাও গলদঘর্ম হয়ে যান! এতকিছুর পরও এই মডেলগুলোর সাহায্যে আমরা মহাবিশ্বকে সাধারণ আপেক্ষিকতার গাণিতিক ছাঁচে ফেলে ব্যাখ্যা করতে পারি। এই মডেলগুলোর মধ্যে যেটার সাথে পর্যবেক্ষণলব্ধ ফলাফল মিলে যাবে সেটাই সঠিক মডেল হিসেবে টিকে থাকবে, বর্তমানে উন্মুক্ত ও বদ্ধ এই দুটো মহাবিশ্বের মডেলই টিকে আছে, এর কোনোটাকেই বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়ার মতো শক্ত পর্যবেক্ষণলব্ধ তথ্য এখনো আমাদের হাতে আসেনি।

নন ইউক্লিডিয়ান মহাবিশ্বে পাশাপাশি বয়ে চলা দুটো সরলরেখা সেখানে পরষ্পরকে ছেদ করে অথবা দূরে সরে যায়। সেই মহাবিশ্বে ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি কখনো ১৮০° হয় না। ছবির ক্রেডিট: NASA / WMAP Science Team

গ্যালাক্সিগুলোর দূরে সরে যাওয়া থেকে বোঝা যায় অতীতে নিশ্চয়ই এগুলো একসাথেই এঁটে ছিল। উপমার বেলুনটিকে যদি আমরা সময়ের উল্টোদিকে নিয়ে যাই তবে এমন এক সময়ে পৌঁছাবো যখন বেলুনটি চুপসে আছে, ডটগুলো একসাথে জড়ো হয়ে আছে, বেলুনটির ব্যাসার্ধ শূন্য হয়ে আছে, আর সময় থমকে আছে। ঠিক এভাবেই ধরে নিতে পারি গ্যালাক্সিগুলো অতীতে একসময় আক্ষরিকভাবেই “একটার ওপরে আরেকটা” জড়ো হয়ে ছিল, এবং তখন স্কেল ফ্যাক্টর R ছিল শূন্য। ধারণা করা হয় সেই প্রাথমিক মুহূর্তে (প্রায় ১৩.৭৭ বিলিয়ন বছর আগে) একটি প্রচণ্ড শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটেছিল যার কারণে পদার্থগুলো তীব্র বেগে দিগ্বিদিক ছড়িয়ে পড়ে। এই বিস্ফোরণটিকে বলা হয় বিগ ব্যাং, এটা এমন এক অস্বাভাবিক বিস্ফোরণ ছিল যা মহাবিশ্বের প্রতিটি বিন্দুতে একসাথে ঘটেছিল। প্রতিটি বিন্দু বলতে আক্ষরিকভাবে প্রতিটি বিন্দুই, এক্ষেত্রে মহাবিশ্বটা সসীম হলেও যা, অসীম হলেও তা। মহাবিশ্ব যদি সসীম হয়ে থাকে, তাহলে বিস্ফোরণটি শুরু হয়েছিল শূন্য আয়তন থেকে। এর মানে এই নয় যে বস্তুপিণ্ডটি খুব ঘন আকারে অল্প মাত্রায় “ভেতরে” কুঁচকে ছিল এবং একপর্যায়ে বিস্ফোরিত হয়ে “বাইরের” শূন্য স্পেইসে ছড়িয়ে পড়ে! আগেই বলেছি একটি সীমাবদ্ধ মহাবিশ্বে “ভেতরে” “বাইরে” বলতে কিছু নেই, কারণ পুরো স্পেইস নিয়েই সসীম মহাবিশ্ব। বিষয়টি অনেকের মাথার ওপর দিয়ে যেতে পারে, কিন্তু এই গাণিতিক মডেলটিই মহাবিশ্বের একটি যৌক্তিক দৃশ্যকল্প দাঁড় করায় এবং এর বৈশিষ্ট্যগুলো ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে। একটি অসীম মহাবিশ্ব জন্ম থেকে সবসময়ই অসীম হিসেবে সম্প্রসারিত হবে। আর একটি সসীম মহাবিশ্বের জন্মলগ্নে অবশ্যই প্রাথমিক পদার্থগুলো খুব ঘনভাবে একসাথে এঁটে থাকার ফলে অকল্পনীয় উত্তপ্ত হবে, সসীম মহাবিশ্বে সম্প্রসারণ শুরুর এই মুহূর্তটিকে “স্পেইস-টাইম সিঙ্গুলারিটি” বা সংক্ষেপে “সিঙ্গুলারিটি” বলা হয়। বিগ ব্যাং এবং সিঙ্গুলারিটির প্রাথমিক অবস্থা সম্পর্কে খুব কমই জানা গেছে।

ছবির ক্রেডিট: IPAC/Caltech, by Thomas Jarrett