মহাবিশ্বের মহাপ্রসারণ এবং তরঙ্গ কথন

মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি (৬ষ্ঠ পর্ব)
মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি (৬ষ্ঠ পর্ব)
  1. মহাবিশ্ব, এই যাত্রার শেষ কোথায়?
  2. মহাবিশ্ব মাপার ফিতে
  3. মিল্কিওয়ে: আমাদের নক্ষত্রবাড়ি
  4. অন্যান্য গ্যালাক্সিরা
  5. মহাবিশ্বের মহাবিন্যাস
  6. মহাবিশ্বের মহাপ্রসারণ এবং তরঙ্গ কথন
  7. রেড শিফট এবং ডপলার ইফেক্ট
  8. অলবার্সের প্যারাডক্স
  9. মহাবিশ্বের নানা মডেল
  10. মহাবিশ্বের গাণিতিক প্রকৃতি
  11. মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ

বিজ্ঞানী এডউইন হাবল ১৯৩০ সালে পর্যবেক্ষণ করে দেখেছিলেন গ্যালাক্সিগুলো একে অন্যের সাপেক্ষে দূরে সরছে, তিনি আরও দেখতে পেয়েছিলেন গ্যালাক্সিগুলোর অবস্থানের সাথে দূরে সরার হার বিশেষভাবে সম্পর্কিত, অর্থাৎ, একটা গ্যালাক্সি আরেকটা গ্যালাক্সি থেকে যত দূরে অবস্থিত সে সেই সাপেক্ষে তত দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছে। গ্যালাক্সির এই দূরে সরার হারটি হাবলের নীতি অনুসরণ করে। এই নীতি অনুযায়ী গ্যালাক্সির দূরত্বকে হাবলের বিশেষ ধ্রুবকের সাথে গুণ করলে গ্যালাক্সিটি কত বেগে দূরে সরছে সেই হিসেব পাওয়া যায়। অন্যভাবে আমরা বলতে পারি গ্যালাক্সির এই বেগটি তার দূরত্বের সমানুপাতিক। মনে করি একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর কয়েকটা গ্যালাক্সি আছে, এখন প্রথম এবং দ্বিতীয় গ্যালাক্সির মধ্যেকার দূরত্ব যে হারে বাড়বে সেই তুলনায় প্রথম এবং তৃতীয় গ্যালাক্সির দূরত্ব দ্বিগুণ হারে বাড়বে। তবে খুব কাছের দুটো গ্যালাক্সির মধ্যে এই নিয়ম কার্যকর থাকে না। কারণটা হচ্ছে মহাকর্ষ। যেমন আমাদের “হোম” গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ের সাথে আমাদের পড়শী গ্যালাক্সি অ্যান্ড্রোমিডার দূরত্ব দিনদিন কমছে, কারণ গ্যালাক্সি দুটো যথেষ্ট কাছে হওয়ায় একে অন্যের মহাকর্ষের টান উপেক্ষা করতে পারছে না।

অতি দূরবর্তী দুটো গ্যালাক্সির মধ্যেকার সম্প্রসারণের হার মাপার ক্ষেত্রেও হাবলের নীতি অসীম মান দেয়। এদিকে আইনস্টাইনের স্পেশাল থিয়োরি অভ রিলেটিভিটি অনুযায়ী কোনোকিছুই আলোর চেয়ে দ্রুততর হতে পারে না। এখন এই দুটো বিষয় কি সাংঘর্ষিক হয়ে গেল? না, স্পেইসের ভেতর আলোর চেয়ে বেশি গতিতে কেউই ছুটতে পারে না। কিন্তু স্পেইস নিজে যেকোনো গতিতে ফাঁপতে পারে। এতে আইনস্টাইন সাহেবের কোনো মাথাব্যাথা নেই। সেটা আমরা বিস্তারিত জানব, তবে এখন না, পরবর্তীতে যখন রেড শিফটের ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করব তখন এই বিষয়টা মাথায় রাখলেই হবে।

জ্যোতির্বিদ এডউইন হাবল কীভাবে বুঝলেন গ্যালাক্সিগুলো একে অন্যের কাছ থেকে পালাচ্ছে? আসলে এক্ষেত্রে তিনি দূর গ্যালাক্সি থেকে আসা আলোর লাল সরণ (Red shift) পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। কী এই লাল সরণ? বুঝতে হলে আমাদেরকে আগে “ডপলার ইফেক্ট” সম্পর্কে জানতে হবে।

পানিতে ঢিল ছুড়লে পানির ঢেউ গোল হয়ে চারদিকে ছড়ায়, এই ঢেউগুলোর দুইটা করে অংশ থাকে, সবচেয়ে উঁচু অংশ এবং সবচেয়ে নিচু অংশ। উঁচু অংশটিকে শীর্ষ বিন্দু এবং নিচু অংশটিকে পাদ বিন্দু বলে। এক শীর্ষ বিন্দু থেকে আরেক শীর্ষ বিন্দুর মধ্যেকার দূরত্বকে তরঙ্গদৈর্ঘ্য বলে। এক সেকেন্ডে যতগুলা তরঙ্গ একটা নির্দিষ্ট বিন্দুকে অতিক্রম করে তাকে ফ্রিকোয়েন্সি বলে। অর্থাৎ, ছোটো তরঙ্গের ফ্রিকোয়েন্সি বেশি, বড়ো তরঙ্গের ফ্রিকোয়েন্সি কম।

হাই ফ্রিকোয়েন্সি এবং লো ফ্রিকোয়েন্সি।

• তরঙ্গের গতিবেগকে তরঙ্গদৈর্ঘ্য দিয়ে ভাগ দিলে ফ্রিকোয়েন্সি পাওয়া যায়।

• তরঙ্গের গতিবেগকে ফ্রিকোয়েন্সি দিয়ে ভাগ দিলে তরঙ্গদৈর্ঘ্য পাওয়া যায়।

• তরঙ্গের ফ্রিকোয়েন্সিকে তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সাথে গুণ করলে তরঙ্গের গতিবেগ পাওয়া যায়।

এই সূত্রকে বলে তরঙ্গের Golden rule

তরঙ্গ কিন্তু পানির মতো এত সহজ জিনিস না, তরঙ্গ খুবই জটিল হতে পারে, হতে পারে ছোটোবেলায় স্কুলের খাতায় আঁকা হিজিবিজির মতো। ওপরে পানির ঢেউয়ের উদাহরণটা টেনেছিলাম খুব সহজে একটা ধারণা দেবার জন্য। পানির তরঙ্গ ছাড়াও আরো অনেক কিছুর তরঙ্গ আছে, যেমন : শব্দের তরঙ্গ, আলোর তরঙ্গ, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ইত্যাদি।

কোনো উৎস থেকে যদি আলো বা শব্দ তরঙ্গ আকারে আসে, আর যদি কোনো পর্যবেক্ষক এই তরঙ্গগুলো রিসিভ করেন। তাহলে তিনি প্রতি সেকেন্ডে মোট কতটি তরঙ্গ রিসিভ করবেন সেটা পর্যবেক্ষক এবং উৎসের আপেক্ষিক গতির ওপর নির্ভর করে। উৎস বা পর্যবেক্ষক যদি একে অপরের দিকে গতিশীল হয় তাহলে উৎস থেকে নির্গত তরঙ্গগুলো পর্যবেক্ষক ঘন ঘন রিসিভ করবেন। আর যদি উৎস বা পর্যবেক্ষক বিপরীত দিকে গতিশীল থাকেন তাহলে পর্যবেক্ষকের কাছে তরঙ্গগুলো লম্বা এবং হালকা হয়ে পৌঁছুবে।

এটাই ডপলার ইফেক্ট। যা অস্ট্রিয়ান পদার্থবিদ জোহান ডপলার (১৮০৩-১৮৫৩) আবিষ্কার করে গেছেন। ডপলার ইফেক্টটিকে শব্দের সাহায্যে ডাচ আবহাওয়াবিদ “ক্রিস্টোফ হেনড্রিক ডিদারিকাস বুয়েস ব্যালোট” (১৮১৭-১৮৯০) একটি খোলা ট্রেনে ট্রাম্পটারস অর্কেস্ট্রা (একপ্রকার বাদ্যযন্ত্র) বাজিয়ে পরীক্ষা করে প্রমাণ করেছিলেন।

ডপলার ইফেক্ট

হাবল দূরবর্তী গ্যালাক্সির গতিবেগ মাপতে এই ডপলার ইফেক্টের সাহায্য নিয়েছিলেন। তিনি আমাদের চারপাশে প্রাপ্ত আলোর ফ্রিকোয়েন্সির সাথে দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে আসা আলোর ফ্রিকোয়েন্সির তুলনা করে গ্যালাক্সির গতিবেগ মেপেছিলেন। কীভাবে? সেটাই জানব এখন :

আলো হচ্ছে মূলত বিদ্যুচ্চৌম্বকীয় তরঙ্গের বিকিরণ। তরঙ্গ কী সেটা ওপরে আলোচনা করেছি। বৈদ্যুতিক তরঙ্গ এবং চৌম্বকীয় তরঙ্গ মিলে হয় বিদ্যুচ্চৌম্বকীয় তরঙ্গ, বৈদ্যুতিক তরঙ্গ এবং চৌম্বকীয় তরঙ্গ একে অপরের সাপেক্ষে আড়াআড়িভাবে থাকে। এক তরঙ্গের মান বাড়লে অপরটির মান কমে, এভাবেই বিদ্যুচ্চৌম্বকীয় তরঙ্গ এগিয়ে চলে।

বিদ্যুচ্চৌম্বকীয় তরঙ্গ

তো, যখন এই তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণের মাত্রা ০.০০০০২ থেকে ০.০০০৩ সে.মি এর মধ্যে থাকে, কেবল তখনই আমাদের চোখ এটিকে ‘আলো’ হিসেবে শনাক্ত করতে পারে। এই সাইজের চেয়ে ছোটো বা বড়ো তরঙ্গদৈর্ঘ্যের প্রতি আমাদের চোখ সংবেদনশীল নয়। তার মানে বিদ্যুচ্চৌম্বকীয় বিকিরণের একটি নির্দিষ্ট সাইজের তরঙ্গদৈর্ঘ্যগুলোকে আমরা ‘আলো’ বলি। এই দৃশ্যমান আলোর বর্ণালীর মাঝে সবচেয়ে ছোটো তরঙ্গদৈর্ঘ্য হচ্ছে বেগুনি আলোর, তারপর যদি আমরা পর্যায়ক্রমে নীল, আকাশী, সবুজ, হলুদ, কমলা এবং লালের তরঙ্গদৈর্ঘ্য বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাবো বর্ণালীর তরঙ্গদৈর্ঘ্য ক্রমশ বড়ো হচ্ছে। বর্ণালীর সবচেয়ে বড়ো দৃশ্যমান তরঙ্গ হলো লাল। দৃশ্যমান আলোর চাইতে বড়ো তরঙ্গদৈর্ঘ্যগুলোর বিকিরণকে পর্যায়ক্রমে ইনফ্রারেড, মাইক্রোওয়েভ এবং রেডিয়ো তরঙ্গ বলা হয়। একইভাবে দৃশ্যমান আলোর চাইতে ছোটো তরঙ্গদৈর্ঘ্যগুলোর বিকিরণকে পর্যায়ক্রমে আল্ট্রাভায়োলেট রে, এক্স রে, এবং গামা রে বলা হয়।

দৃশ্যমান আলোর বর্ণালী

বিদ্যুচ্চৌম্বকীয় বিকিরণের সকল তরঙ্গদৈর্ঘ্য একই গতিতে, অর্থাৎ আলোর বেগে ভ্রমণ করে। একটি নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি থেকে সব দৈর্ঘ্যের বিদ্যুচ্চৌম্বকীয় তরঙ্গ বিকিরিত হয়। নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি থেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ভিন্ন ভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্য নির্গত হয়। যেমন, নক্ষত্রের মধ্যে নিউক্লিয়ার ফিউশনের কারণে তাতে হাইড্রোজেন পরমাণু ভেঙে হিলিয়াম পরমাণু তৈরি হয়, সাথে তৈরি হয় প্রচুর পরিমাণে তাপ ও আলো। (কীভাবে হয় সেটা আরেকদিন বিস্তারিত বলব)। তারপর একদিন যখন এই ফিউশনের জ্বালানি অর্থাৎ সব হাইড্রোজেন ফুরিয়ে যায়, তখন ফিউশন বন্ধ হবার ফলে নক্ষত্রের বাইরের অংশ কেন্দ্রের দিকে চাপ দেয়, প্রচণ্ড এই চাপে তাপমাত্রা আরও বেড়ে যায়, হিলিয়াম পুড়তে শুরু করে। এভাবে সেখানে রেডিয়ো ব্যান্ডের বিকিরণে বৈদ্যুতিক চার্জযুক্ত কণা ইলেকট্রন এবং প্রোটনের সাহায্যে একে একে সমস্ত পদার্থ তৈরি হয়। চার্জিত কণাগুলো বিকিরণের মাধ্যমে চারপাশে শক্তি ত্যাগ করে, যার ফলে চার্জিত কণার শক্তি হ্রাস পায়। চূড়ান্তভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চার্জিত কণার গতির কারণেই সবধরনের বিকিরণ ঘটে। উদাহরণস্বরূপ যখন আমরা একটুকরো লোহাকে গরম করি, তখন এর মধ্যে অবস্থিত ইলেকট্রনগুলোর এলোপাতাড়ি ছোটাছুটি বেড়ে যায়, যার ফলে সেখান থেকে তাপ বা ইনফ্রারেড বিকিরিত হয়। ইলেকট্রনের এই এলোপাতাড়ি দৌড়ঝাঁপ যত বাড়ে ফ্রিকোয়েন্সির বিকিরণ ততই প্রকট হয়, আমরা দেখতে পাই লোহা গরম হয়ে গেছে, লাল হয়ে গেছে, ইত্যাদি।

পরমাণুর চারপাশে নৃত্যরত ইলেকট্রন (ছবিটি প্রতীকী)

যেকোনো উৎস থেকে নির্গত বিকিরণে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে বিভিন্ন পরিমাণে শক্তি থাকে। অর্থাৎ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ভিন্নতার ওপর ভিত্তি করে বিকিরণের তীব্রতা ভিন্ন হতে পারে।