অঁতোয়ান লাভোয়াজিয়ে, আধুনিক রসায়ন বিজ্ঞানের জনক

আগেকার দিনের প্রায় মা বাবারা সন্তান বড়ো হয়ে কী হবে না হবে সেটা নিজেরাই ঠিক করে দিতেন। তারপর শুরু হত সন্তানকে “এটাই তোর পথ বাবা, এটাকেই ধ্যান জ্ঞান মনে করে জান উজার করে দে” -টাইপ কলা খাওয়ানো।

এই কলা খাওয়ানোর প্রথা এখনো পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। প্যাশনকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়ার পথে আজো বাবা মায়েরা প্রধান অন্তরায়।

তো ১৭৪৩ সালের ২৬ শে আগস্টে জন্ম নেয়া অঁতোয়ান-লোরঁ দ্য লাভোয়াজিয়ে’র বেলায় এর ব্যতিক্রম হবে কেন? বাবা ফরাসি পার্লামেন্টের অ্যাটর্নি, তাই ছেলেকেও আসতে হবে এই লাইনে, তবেই না বাপের মুখ উজ্জল হবে!

এই সূত্রে বাঁধা পড়ে ১১ বছর বয়স থেকে শুরু হলো লাভোয়াজিয়ে’র পিঠে স্কুলব্যাগ ঝুলানো। এরপর হাঁটি হাঁটি পা পা করে স্কুল থেকে কলেজ। লড়াকু উকিল পিতার বেজায় দম। ছেলেকে আইনের ক্লাসে ভর্তি করিয়েই ছাড়লেন।

ছেলে কলেজে যায় আসে,

কিন্তু পিতার বুক ছেয়ে যায় ত্রাসে!

ছেলে যে আইনের চেয়ে বিজ্ঞানকে

বেশি ভালোবাসে!

গদ্যের ভেতর ছন্দ ঢুকানোর মতোই লাভোয়াজিয়ে আইনের ছাত্র হয়েও বিজ্ঞান নিয়ে পড়ে রইলেন।

প্রতিভাবান ছাত্ররা পড়াশোনায় মনোযোগী থাকে না। এরপরও পরীক্ষার খাতায় তারা ঠিকই পাশমার্ক তুলে ফেলে। এখানেও তাই হলো। তিনি পরীক্ষায় উৎরে গেলেন।

কিন্তু এদিকে নিজের বাড়িতেই ছোটোখাটো ল্যাবরেটরি বানিয়ে নিয়ে যে গবেষণা আর এক্সপেরিমেন্ট শুরু করলেন, তা চলল আজীবন।

প্যারিস বিজ্ঞান অ্যাকাডেমিতে সদস্যপদ লাভ

ভয়ে ভয়ে প্যারিস বিজ্ঞান অ্যাকাডেমিতে সদস্যপদের আবেদন করেছিলেন। আবেদন মঞ্জুর! স্বপ্নেও ভাবেননি এত সহজে সদস্যপদ পেয়ে যাবেন। যাইহোক একটা প্ল্যাটফর্ম তো পাওয়া গেল!

অ্যাকাডেমিতে সায়েন্স রিলেটেড লেখালিখি পেশ করে প্রশংসা কুড়ালেন। অনেক জ্ঞানীগুণীর সাথেও ভাব হলো। পরের বছর অ্যাকাডেমির পক্ষ থেকে সায়েন্স রিলেটেড কম্পিটিশনে একেবারে প্রথম হয়ে গেলেন! ব্রাভো!

একদিন দেখলেন একজন রসায়নবিদ সবাইকে পরীক্ষার মাধ্যমে দেখাচ্ছেন কীভাবে একটি বস্তুকে আরেক বস্তুতে রূপান্তরিত করা যায়। তো, রসায়নবিদ একটি পাত্রে পানি রেখে তাপ দিয়ে ফুটাতে লাগলেন। পানি বাষ্প হয়ে উড়ে গেলে দেখা গেল তলানিতে কিছু মাটি জমেছে! রসায়নবিদ বললেন- “এর থেকেই প্রমাণ হয় পানি মাটি থেকে তৈরি”!

অনেকটা বর্তমান ফ্লাট আর্থ সমর্থকদের কুযুক্তির মতো আরকি!

লাভোয়াজিয়ে ব্যাপারটা নিয়ে ভাবলেন। নিজেই এক্সপেরিমেন্ট করে বের করলেন- তলানিতে যা থাকে তা ওই পাত্রেরই ক্ষয়ে যাওয়া অংশ। তিনি পানি ফুটানোর আগে ও পরে পাত্রের ওজন পরিমাপ করে ব্যাপারটা ক্লিয়ার হলেন। এ থেকে তিনি সিদ্ধান্তে এলেন- পানি ফুটানোর কারণেই পাত্রের ক্ষয় হচ্ছে এবং এর কারণে কোনো মাটি তৈরি হচ্ছে না। যদিও আমাদের কাছে সিদ্ধান্তটা সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু তখনকার সময়ে এটা ছিল হাজার বছরের পুরোনো ধ্যানধারণায় বিশাল আঘাত।

গবেষণা চালিয়ে যেতে কী কী লাগে? মেধা, অধ্যাবসায় আর প্রচুর টাকা। টাকা যোগাতে চাকরি নিয়েছিলেন “ফেরম” নামের এক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে। দু’বছর চাকরির পর এক বসের সু-নজরে পড়ে যান। সেই সু-নজর এতটাই প্রকট ছিল যে বস তার একমাত্র মেয়ে মেরি এ্যার্নির সঙ্গে লাভোয়াজিয়ে’কে একেবারে বিয়েই দিয়ে দিলেন! মেরি তখন মাত্র ১৪ বছরের বালিকা!

বলছিলাম গবেষণার কথা।

লাভোয়াজিয়ে’র গবেষণা তুমুলবেগে চলতে লাগল।

জীবদেহের ওপর চুম্বকত্বের প্রভাব, অভিকর্ষ পানি সরবরাহ,

রঙের তত্ত্ব,

বাঁধাকপির বীজ থেকে তেল নিষ্কাশন, চিনি তৈরি,

কয়লা থেকে পিচ তৈরি,

গোলাবারুদের উন্নয়ন,

রসায়ন শাস্ত্রে আজো ব্যবহার করা হয় এরকম প্রচুর শব্দ তৈরি ও সংজ্ঞা নিরূপণ,

বা রসায়নের ওপর অভিধান তৈরি করা সহ আরো কত কী!

তবে তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ হলো- নির্দিষ্ট অনুপাতে অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তার মধ্যে বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গ চালনা করে পানি উৎপন্ন করা। এখানেই শেষ নয়, রচনা করলেন তার যুগান্তকারী বই অ্যালিমেন্টরি ট্রাইস অফ কেমিস্ট্রি । এই বইয়ের কোথাও তিনি একটিও অজানা তথ্য যুক্ত করেন নি। তিনি তো আর এরিস্টটল না!

যাহোক,

রসায়ন বিজ্ঞান যখন মধ্যযুগীয় বিচিত্র চিন্তাভাবনায় সীমাবদ্ধ ঠিক সেই সময় লাভোয়াজিয়ে তার গবেষণার মাধ্যমে খুলে দেন রসায়নের এক নতুন জানালা।

আধুনিক রসায়ন বিজ্ঞানের জনক হতে আর কী লাগে বলুন?

দেশে ফরাসী বিপ্লব চলছে। রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করে দিয়ে দেশ চালাচ্ছে বিপ্লবী ট্র‍্যাইব্যুনাল। তৈরি হয়েছে নতুন বিপ্লবী আইন। হাজার হাজার বিপ্লব বিরোধীদের ধরে ধরে “গিলোটিন” নামক নৃশংস যন্ত্র দিয়ে শিরোচ্ছেদ করা হচ্ছে! কী বিভৎসতায় মাখানো সে ইতিহাস!

লাভোয়াজিয়ে রাজনীতি করতেন না, এসবের ধারেকাছেও নিজেকে নিয়ে যাননি কখনো। তারপরও এই নিভৃত মানুষটা একচোখা বিপ্লবীদের শ্যেনদৃষ্টিতে পড়ে গেলেন। ১৭৯১ সালের ৭ জানুয়ারি বিপ্লবী দলের সংবাদপত্রে তার একটি প্রবন্ধ ছাপা হয়।

এক বিপ্লবী নেতা তাকে সরিয়ে নিজেই বিজ্ঞানের জগতে বিখ্যাত হওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে। সে লাভোয়াজিয়ে’র বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে! লাভোয়াজিয়ে রাজতন্ত্রের সমর্থক, প্রতারক, ঠক, অসদুপায়ে লাখ লাখ লুইস উপার্জন করে প্যারিসের শাসনকর্তা হতে চাওয়া বিদ্রোহী ব্লা ব্লা ব্লা।

লাভোয়াজিয়ে এসবে কান দিলেন না। কিন্তু তাঁকে ঘিরে একের পর এক ষড়যন্ত্র চলতেই থাকে। শেষমেশ তাঁকে কারাগারে বন্দী করা হয়। তবুও পাহাড়ের মতোই অটল ছিল তার মনোভাব। নিশ্চিত মৃত্যু তাকে আলিঙ্গন করছে জেনেও তার এক আত্মীয়কে চিঠিতে লিখেছেন-

“আমি দীর্ঘ সুখী জীবন পেয়েছি। এখন বয়সের ভারে ক্লান্ত। পেছনে ফেলে এসেছি কিছু জ্ঞান, সামান্য কিছু গৌরব। পৃথিবীর সামান্য একজন মানুষ এর বেশি আর কী আশা করতে পারে?”

বিচারের নামে শুরু হলো প্রহসন। প্রধান সাক্ষী লাভোয়াজিয়ে’র ই এক কর্মচারী, যাকে আগে চুরির অপরাধে বরখাস্ত করা হয়েছিল! লাভোয়াজিয়ে’র উকিল বিজ্ঞানে তার অবদানের কথা তুলে ধরতে চাচ্ছিলেন অমনিই প্রতিপক্ষের থেকে জবাব এল-  “বিপ্লব বিজ্ঞানকে চায় না, তার প্রয়োজন ন্যায়ের”!

শেষ হলো প্রহসনের এক বিচার! মানবতা ও সত্যের মুক্তিদাতাদের জন্য এ আর নতুন কী? যে প্রহসনের স্বীকার হয়ে হাইপেশিয়া, জর্দানো ব্রুনো, গ্যালিলিও‘রা আজো মানব ইতিহাসের দগদগে ক্ষত হয়ে আছেন!

সেই ক্ষতে প্রায়শ্চিত্তের প্রলেপের বদলে রচিত হলো আরেকটি কালো ইতিহাস! লাভোয়াজিয়ে’র বিরুদ্ধে বিদেশী ও দেশের শত্রুদের সঙ্গে যড়যন্ত্র করার অভিযোগ তুলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলো।

গিলোটিনে এক মুহূর্তে তারা মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। মৃত্যুর আগে শেষ চিঠিতে তিনি স্ত্রীকে লিখেছেন–

তোমার স্বাস্থ্যের যত্ন নিও প্রিয়তমা, দুঃখ কোরো না, আমি আমার কাজ শেষ করেছি, তার জন্যে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিও।

ল্যাবরেটরিতে অঁতোয়ান লাভোয়াজিয়ে, ডানপাশে খোলা দরজা দিয়ে গিলোটিন দেখা যাচ্ছে। Credit: OXFORD SCIENCE ARCHIVE / HERITAGE IMAGES / SCIENCE PHOTO LIBRARY
ল্যাবরেটরিতে অঁতোয়ান লাভোয়াজিয়ে, ডানপাশে খোলা দরজা দিয়ে গিলোটিন দেখা যাচ্ছে।
Credit: OXFORD SCIENCE ARCHIVE / HERITAGE IMAGES / SCIENCE PHOTO LIBRARY

❝শুধু একটি মুর্হূত লেগেছিল তার মাথাটি ছিন্ন করতে। তেমন আর একটি মাথা পেতে হয়তো আমাদের আরো শত বছর অপেক্ষা করতে হবে❞

–বিজ্ঞানী লরিও