নক্ষত্র

নক্ষত্র জগৎ

নক্ষত্র বিশাল,

তাই গ্র‍্যাভিটিও বেশি,

চাপ আর তাপমাত্রাও বেশি বেশি,

ব্যাস, শুরু হয়ে গেল নিউক্লিয়ার ফিউশন!

কখন শুরু হলো? ঠিক যখন তাপমাত্রা ১ কোটি কেলভিনে গিয়ে ঠেকল! নক্ষত্রের মূল উপাদান হিসেবে থাকে হাইড্রোজেন। প্রচণ্ড প্রেশারে হাইড্রোজেনের পরমাণুগুলো কাছাকাছি আসে।

• দুটো হাইড্রোজেন নিউক্লেই বিক্রিয়া করে দুটো ডিউটেরিয়ামে পরিণত হয়। একইসাথে তৈরি হয় একটি করে পজিট্রন ও নিউট্রিনো। উল্লেখ্য : নিউক্লিয়াসের মূল অংশকে নিউক্লেই বলে

• তখন পজিট্রন আর ইলেকট্রন মুখোমুখি সংঘর্ষে ধ্বংস হয়ে যায়! এবং গামা রে-র মাধ্যমে দুটি ফোটন এবং শক্তি নির্গত হয়।

• দুটো ডিউটেরিয়ামের কথা বলছিলাম, ওরা আরেকটি হাইড্রোজেনের সাথে রিলেশনে জড়ায়, ফলে জন্ম হয় হিলিয়াম (³He)-এর। এবারও নির্গত হয় গামা রে এবং শক্তি।

• এই হিলিয়াম(³He) এবার আরেকটি হাইড্রোজেনের নিউক্লেই এর সাথে রিলেশনে জড়ায়। জন্ম হয় হিলিয়াম (⁴He)-এর।

নক্ষত্রের শ্রেণীবিভাগ :

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, চারটি হাইড্রোজেন পরমাণু বিভিন্ন ধাপে মিলিত হয়ে একটি চূড়ান্ত হিলিয়াম(⁴He) পরমাণু তৈরি হচ্ছে। এটাই নিউক্লিয়ার ফিউশন, নিউক্লিয়ার ফিউশনের মাধ্যমে মূল ভরের ০.৩% শক্তিতে পরিণত হয়। এই শক্তি আলো ও তাপ আকারে আমাদের কাছে পৌঁছে। নিউক্লিয়ার ফিউশন ঘটছে বলেই দূরের নক্ষত্রগুলো রাতের আকাশে জ্বলজ্বল করে। সূর্য থেকে আমরা প্রয়োজনীয় শক্তি পেয়ে জীবনধারণ করতে পারি, আর গাছগুলো ফটোসিন্থেসিসের মাধ্যমে নিজের খাদ্য তৈরি করতে পারে। ইত্যাদি..

সব নক্ষত্র সমান হয় না, নক্ষত্রদের মধ্যে ছোটো-বড়ো, হালকা-ভারী, তেজী-নিস্তেজ এরকম বিভিন্ন ক্লাস আছে। তো, আমরা নাগালের বাইরে থাকা এসব নক্ষত্রগুলোকে কীভাবে ক্লাসিফাই করি? উত্তর হলো : তার বর্ণালী দেখে, তার তাপমাত্রা মেপে। এসব মাপজোখ করে আমরা নক্ষত্রদের সাতটি অভিজাত শ্রেণীতে বিভক্ত করে ফেলেছি, এগুলো হচ্ছে-

• O

• B

• A

• F

• G

• K

এবং

• M

ক্লাসগুলোকে মনে রাখার মজার একটা উপায় আছে :

Oh be a fine guy/girl, kiss me.

এবার একটা একটা করে প্রত্যেকটা ক্লাসে উঁকি দিবো :

O শ্রেণীর নক্ষত্র

এরা মহাবিশ্বের সবচেয়ে দুর্লভ নক্ষত্র। এতই দুর্লভ যে আমাদের মিল্কিওয়েতে প্রতি ৩০ লক্ষ নক্ষত্রের মধ্যে সার্চ দিলে একটা O শ্রেণীর নক্ষত্র খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। এরা খুবই হট, খুবই ব্রাইট। পৃষ্ঠের তাপমাত্রা কমপক্ষে ২৫ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস। এরা গড়ে ৬০টা সৌরভরের সমান, সূর্যের চেয়ে ১৫ গুণ বড়, এবং ১৪ লক্ষ গুণ বেশি উজ্জ্বল হতে পারে। এদের গায়ের রং তীব্র নীল। কালপুরুষ নক্ষত্রমণ্ডলে একটি নক্ষত্রকে আমরা “ঊষা” নামে ডেকে থাকি, ঊষা আসলে খুব কাছাকাছি অবস্থান করা তিনটি নক্ষত্র, যাদেরকে পৃথিবী থেকে খালি চোখে আলাদাভাবে দেখা যায় না। এই তিনটি নক্ষত্রের একটি হচ্ছে এই O শ্রেণীর নক্ষত্র, ইংরেজিতে একে বলে “জেটা পাপিস”।

B শ্রেণীর নক্ষত্র

এরাও মহাবিশ্বে বিরল, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে জনপ্রতি (পড়ুন নক্ষত্রপ্রতি) ৮০০ টা নক্ষত্রের মাঝে ১ টা নক্ষত্র B শ্রেণীর হয়ে থাকে। এরা O শ্রেণীর নক্ষত্রের চেয়ে কম ফর্সা, পৃষ্ঠের তাপমাত্রা হয় ১২ হাজার থেকে ২৫ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসের ভেতর। পাল্লায় মাপলে বাটখারা হিসেবে ১৮ টা সূর্য লাগতে পারে, পেটের ভেতর ৭ টা সূর্য অনায়াসে ঢুকে যেতে পারে এবং সূর্যের চেয়ে ২০ হাজার গুণ বেশি উজ্জ্বল আলো দিতে পারে। এদের গায়ের রং নীল থেকে হালকা নীলের ভেতর হয়ে থাকে। কালপুরুষ নক্ষত্রমণ্ডলের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র “বাণরাজা” হচ্ছে একটি B শ্রেণীর নক্ষত্র, বাণরাজার ইংরেজি নাম “রাইজেল”।

A শ্রেণীর নক্ষত্র

ফেব্রিক হোয়াইটনার ব্যবহারে কাপড় উজ্জ্বল সাদা থেকে হালকা নীলাভ রং ধারণা করে, A শ্রেণীর নক্ষত্রদের দেখলে ফেব্রিক হোয়াইটনারের কথা মনে পড়বেই! কারণ এর গায়ের রং যে সাদাটে নীলচে! মিল্কিওয়েতে প্রতি ১৬০টি নক্ষত্রের মাঝে ১টি A শ্রেণির নক্ষত্রের দেখা মিলে, পৃষ্ঠের তাপমাত্রা সাড়ে ৭ থেকে ১১ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। গড়ে সূর্যের চেয়ে ৩ গুণ ভারী ও আড়াই গুণ বড় হতে পারে। উজ্জ্বলতায় ৮০ টা সূর্যের সমান আলো বিকিরণ করতে পারে। লুব্ধক (ইংরেজিতে সিরিয়াস) ও অভিজিৎ (ইংরেজিতে ভেগা) হলো A শ্রেণীর দুটো নক্ষত্র।

F শ্রেণীর নক্ষত্র

গায়ের রং : সাদা থেকে হলদেটে সাদা।

খুঁজতে হলে : মিনিমাম মিল্কিওয়ের ৩৩টা নক্ষত্র হাতড়াতে হবে।

পৃষ্ঠতাপমাত্রা : ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৭ হাজার ডিগ্রি।

ভর : সর্বোচ্চ ১.৭ টা সৌর ভরের সমান হয়।

স্থুলতা : সর্বোচ্চ ১.৩ টা সূর্যের সমান মোটা হয়।

উজ্জ্বলতা : ৬টা সূর্যের সমান হতে পারে।

উদাহরণ : অগস্ত্য, ইংরেজিতে ক্যানোপাস, এটি আকাশের দ্বিতীয় উজ্জ্বল নক্ষত্র।

G শ্রেণীর নক্ষত্র

এটা হলো সূর্যের ক্লাস, এই ক্লাসের সবাই চেহারায়, গড়নে, দীপনে, চলনে, আচরণে প্রায় সূর্যের মতন। গায়ের রং সাদাটে হলদে থেকে টোটাল হলদে। সারফেস টেম্পারেচার ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার ডিগ্রি পর্যন্ত। আমাদের মিল্কিওয়েতে গড়ে প্রায় ১৩টা নক্ষত্রের মাঝে সূর্যের মতো ১টা নক্ষত্র পাওয়া যায়। সূর্য ছাড়াও এরকম একটি নক্ষত্র হচ্ছে “ব্রহ্মহৃদয়” যাকে ইংরেজিতে “ক্যাপেলা” বলা হয়। এটি অরিগা নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত।

K শ্রেণীর নক্ষত্র

মিল্কিওয়ের প্রতি ৮ টি নক্ষত্র ঘাঁটলে একটি K শ্রেণীর নক্ষত্রের দেখা মিলবে। এদের গায়ের রং হলদেটে-কমলা থেকে টোটাল কমলা হয়। উত্তাপ ও উজ্জ্বলতার দিক দিয়ে এরা সূর্যের অর্ধেক। এরা পৌনে ১টা সূর্যের সমান ভারী এবং এরচেয়ে একচিমটি বেশি বড়ো। এদের পৃষ্ঠভাগ সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস উত্তপ্ত হয়। K শ্রেণীর একটি নক্ষত্র হলো অতর্কিতা, ইংরেজিতে যাকে বলে আর্কটারাস। এটি অবস্থান করে ভূতেশ মণ্ডল নক্ষত্রপুঞ্জে।

M শ্রেণীর নক্ষত্র

গায়ের রং কমলা থেকে লালচে-কমলা, মহাবিশ্বে এই টাইপের নক্ষত্র খুবই সস্তা। মিল্কিওয়েতে প্রতি সোয়া ১টা নক্ষত্র অনুসন্ধান করলে একটি M শ্রেণীর নক্ষত্র পাওয়া যাবে। পৃষ্ঠের তাপমাত্রা যথেষ্ট কম, সাড়ে ৩ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে। তিনটা M শ্রেণীর নক্ষত্র মিলে ভরে ও গায়ে-গতরে একটা সূর্যের সমান হতে পারে। উজ্জ্বলতাও খুবই কম, সূর্যের ০.০৪ ভাগ মাত্র।

হের্ডসব্রং-রাসেল ডায়াগ্রাম :

হের্ডসব্রং-রাসেল ডায়াগ্রাম বা H-R ডায়াগ্রাম হচ্ছে একটি গ্রাফ, যা নক্ষত্রের বর্ণালী এবং ব্রাইটনেসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল। এই ডায়াগ্রাম দিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নক্ষত্রের রং, তাপমাত্রা, উজ্জ্বলতা এবং বর্ণালীর ধরনের ওপর ভিত্তি করে নক্ষত্রের মোট তিনটি পর্যায়কাল শনাক্ত করেছেন :

• ১. মেইন সিকোয়েন্স স্টার

এ সময় নক্ষত্ররা নিউক্লিয়ার ফিউশন ঘটিয়ে হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম উৎপন্ন করে। নক্ষত্রের জীবনের এই পর্যায়টাকে বলা হয় “মেইন সিকোয়েন্স স্টার” বা “মূলধারার নক্ষত্র”। এদের তাপমাত্রা যত বেশি, উজ্জ্বলতাও তত অধিক। একটা মূলধারার নক্ষত্রের ভর যত বেশি থাকে, তার লাইফটাইম তত দ্রুত কমে। একটা নক্ষত্রের জীবনে “মূলধারার নক্ষত্র” পর্যায়টা সবচেয়ে স্থিতিশীল পর্যায়। সে এই অবস্থায় প্রায় পাঁচ বিলিয়ন বছর কাটিয়ে দেয়।

২. জায়ান্ট বা সুপারজায়ান্ট

ফাগুনের দিন শেষ হবে একদিন। প্রায় পাঁচ বিলিয়ন বছর পর যখন এই নক্ষত্রগুলো বুড়িয়ে যায়, ততদিনে নিউক্লিয়ার ফিউশনে সব জ্বালানিও ফুরিয়ে যায়। ফিউশন বন্ধ হবার পর নক্ষত্রের কেন্দ্র প্রবল চাপে চুপসে যায়, আর নক্ষত্রের বাইরের লেয়ারটা ফুলেফেঁপে নক্ষত্রটা বিশালাকার দানবে পরিণত হয়। তখন এদের নাম হয় জায়ান্ট বা সুপারজায়ান্ট। শেষপর্যন্ত এই দানব আর অতিদানবরা তাদের ভর অনুযায়ী প্ল্যানেটারি নেবুলা বা সুপারনোভা বিস্ফোরণে বাইরের লেয়ারটাকে উড়িয়ে দেয়। পড়ে থাকে একটি চুপসানো কোর। সবশেষে নক্ষত্রের মৃত কোর-টা তার ভর অনুযায়ী কোনোটা হোয়াইট ডোয়ার্ফ, নিউট্রন স্টার, আবার কোনোটা ব্ল্যাক হোলে পরিণত হয়।

• ৩. হোয়াইট ডোয়ার্ফ

আমাদের সূর্যের মতো মধ্যবিত্ত নক্ষত্রগুলো “হোয়াইট ডোয়ার্ফ” বা সাদা বামনে পরিণত হয়ে মূলধারার নক্ষত্র থেকে নিচের ক্লাসে নেমে যায়। এরা সাধারণত উত্তপ্ত, হলদেটে-সাদা এবং অনুজ্জ্বল হয়ে থাকে। এদের হাইড্রোজেন জ্বালানি ফুরিয়ে যেতে থাকে, এবং এরা ধীরে ধীরে শীতল, অন্ধকার ব্ল্যাক ডোয়ার্ফে পরিণত হওয়ার দিকে এগিয়ে যায়।

এই তিন পর্যায়কালের নক্ষত্রগুলো আবার অনেকগুলো উপশ্রেণীতে বিভক্ত, সেটা নিয়ে একটু পরে আবার কথা হবে।

ইয়ার্কস লুমিনোসিটি ক্লাসেস :

( উইলিয়াম উইলসন মরগান এবং ফিলিপ কিনান কর্তৃক তৈরি)

লুমিনোসিটি হলো একটি আলোক উৎসের মোট উজ্জ্বলতা। এই আলোক উৎস হতে পারে কোনো নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি। একটি নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি থেকে প্রতি সেকেন্ডে বিকিরিত মোট শক্তিকে বলে এর লুমিনোসিটি। সবধরনের বিদ্যুচ্চৌম্বকীয় তরঙ্গদৈর্ঘ্য এর আওতায় পড়ে।

ইয়ার্কস লুমিনোসিটি ক্লাসিফিকেশন প্রকল্পে নক্ষত্রগুলোকে তাদের বর্ণালীরেখার প্রস্থ অনুসারে বিভিন্ন সারিতে বসানো হয়। যেসব নক্ষত্রের তাপমাত্রা একই রকম, লুমিনোসিটি ক্লাস তাদের মাঝে আকারগত পার্থক্য করে। যেমন : সুপারজায়ান্ট, জায়ান্ট, মূলধারার নক্ষত্র, বা সাব-ডোয়ার্ফ। আমরা এখন শ্রেণী-উপশ্রেণীগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাচ্ছি :

মূলধারার নক্ষত্র, টগবগে তরুণ নক্ষত্রেরা :

মূলধারার নক্ষত্ররা হলো হের্ডসব্রং-রাসেল ডায়াগ্রামের প্রধান সদস্য। এদের শক্তি আসে নিউক্লিয়ার ফিউশন থেকে, তারা হাইড্রোজেনকে হিলিয়ামে পরিণত করে। মহাবিশ্বে ৯০% নক্ষত্রই মূলধারার নক্ষত্র। এদের তাপমাত্রা যত বেশি, এরা ততই উজ্জ্বল। আমাদের সূর্য বর্তমানে একটি মূলধারার নক্ষত্র। মূলধারার নক্ষত্রদের মধ্যে আছে :

  • ডোয়ার্ফ
  • ইয়েলো ডোয়ার্ফ
  • রেড ডোয়ার্ফ

ডোয়ার্ফ

মূলধারার নক্ষত্রদের মাঝে তুলনামূলক ছোটো নক্ষত্রদের বলা হয় ডোয়ার্ফ বা বামন। ডোয়ার্ফরা সর্বোচ্চ আমাদের সূর্যের চেয়ে ২০ গুণ বড়ো হতে পারে, আর উজ্জ্বলতা হতে পারে সূর্যের তুলনায় ২০ হাজার গুণ বেশি। আমাদের সূর্যও একটি বামন নক্ষত্র।

ইয়েলো ডোয়ার্ফ

ছোটো ছোটো মূলধারার নক্ষত্রদের বলা হয় ইয়েলো ডোয়ার্ফ বা হলুদ বামন। আমাদের সূর্য একটি হলুদ বামন নক্ষত্রও বটে।

রেড ডোয়ার্ফ

ছোটো, অনুজ্জ্বল, শান্তশিষ্ট এবং ৪ হাজার কেলভিনের চেয়ে কম পৃষ্ঠতাপমাত্রার নক্ষত্রদের বলা হয় রেড ডোয়ার্ফ বা লাল বামন। মহাবিশ্বের সবচেয়ে কমন নক্ষত্র হলো এই লাল বামন। প্রক্সিমা সেন্টাউরি হলো একটি লাল বামন নক্ষত্র।

জায়ান্ট, বুড়ো দানব নক্ষত্রেরা :

  • রেড জায়ান্ট
  • ব্লু জায়ান্ট
  • সুপারজায়ান্ট

রেড জায়ান্ট

রেড জায়ান্ট বা লাল দানব হচ্ছে এমন কোনো বৃদ্ধ নক্ষত্র যার আয়তন মূল আয়তন থেকে ১০০ গুণ বেশি বেড়ে গিয়েছে। একইসাথে তাপমাত্রা আগের চেয়ে কমে গেছে, অর্থাৎ পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৬৫০০ কেলভিনের নিচে নেমে গেছে। এরা সাধারণত ঘন কমলা রঙের হয়ে থাকে। এরকম একটি নক্ষত্র হলো আর্দ্রা, কালপুরুষ নক্ষত্রমণ্ডলের দ্বিতীয় উজ্জ্বলতম এই নক্ষত্র সূর্যের চেয়ে ২০ গুণ বেশি ভরবিশিষ্ট এবং ১৪ হাজার গুণ বেশি উজ্জ্বল। সে থাকে পৃথিবী থেকে ৬০০ আলোকবর্ষ দূরে।

ব্লু জায়ান্ট

ব্লু জায়ান্ট বা নীল দানবরা হচ্ছে বিশালাকার উত্তপ্ত নীল নক্ষত্র। এই মূলধারার নক্ষত্ররা তাদের ভেতরের সব হিলিয়াম পর্যন্ত পুড়িয়ে বসে আছে।

সুপারজায়ান্ট

জানা নক্ষত্রদের মাঝে সবচেয়ে বড়ো হলো এই সুপারজায়ান্ট বা অতিদানবেরা। একটা সুপারজায়ান্ট নক্ষত্র হতে পারে পুরো সৌরজগতের চাইতেও বড়ো। এরকম একটি নক্ষত্র হলো বাণরাজা, যা কালপুরুষ নক্ষত্রমণ্ডলের সবচাইতে উজ্জ্বল নক্ষত্র। এরা বিরল প্রজাতির নক্ষত্র, এদের মৃত্যু হয় সুপারনোভা বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে, এরপর এরা ব্ল্যাক হোলে পরিণত হয়ে চুপসে যায়।

ফ্যাইন্ট বা জম্বি টাইপ নক্ষত্রেরা :

এদের বিভিন্ন উপশ্রেণীর মধ্যে আছে :

  • হোয়াইট ডোয়ার্ফ
  • ব্ল্যাক ডোয়ার্ফ
  • নিউট্রন স্টার
  • পালসার

হোয়াইট ডোয়ার্ফ

সোজা বাংলায় সাদা বামন। এই টাইপের নক্ষত্ররা হয় ছোটো, খুবই ঘন, আর খুব উত্তপ্ত। যার প্রধান উপাদান হলো কার্বন। এরা হলো সেইসব রেড জায়ান্ট, যাদের বাইরের লেয়ার বিস্ফোরিত হয়ে উড়ে গেছে। রয়ে গেছে শুধু সংকুচিত কেন্দ্রটা, যার আয়তন একটা পৃথিবীর সমান, তবে অনেকগুণ ভারী। এরা ধীরে ধীরে শীতল হচ্ছে, উজ্জ্বলতাও মিইয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এরা পরিণত হবে ব্ল্যাক ডোয়ার্ফে। লুব্ধক নক্ষত্রের প্রতিবেশী নক্ষত্রটি একটি সাদা বামন। এর নাম—সিরিয়াস বি।

ব্রাউন ডোয়ার্ফ

তিমিও একটি মাছ, আর ব্রাউন ডোয়ার্ফও একটি নক্ষত্র—ব্যাপারটা অনেকটা এরকমই। তো, ব্রাউন ডোয়ার্ফ এমন একটি “নক্ষত্র” যার কেন্দ্র এতটাই ছোটো যে এর অপ্রতুল চাপ ও তাপমাত্রার কারণে নিউক্লিয়ার ফিউশন শুরুই হতে পারেনি। এরা খুব একটা উজ্জ্বল না। এর ভর সাধারণত 10²⁸ কেজি থেকে 84 x 10²⁸ কেজির মধ্যে থাকে।

নিউট্রন স্টার

নিউট্রন স্টারেরা হয় খুবই ছোটো, এটি এতই ঘন হয় যে এর ভেতরের প্রেশারে পরমাণুর ইলেকট্রন আর নিউক্লিয়াস ভেঙে একাকার হয়ে নিউট্রনে পরিণত হয়ে যায়। নিউট্রন নক্ষত্রের বাইরে হাইড্রোজেনের পাতলা একটা লেয়ার থাকে। এরা সূর্যের ১.৩৫ থেকে ২.১ গুণ ভারী হয়। তারপরও একটা নিউট্রন নক্ষত্রের ব্যাস হয় মাত্র ৫ থেকে ১৬ কিলোমিটার। তার অকল্পনীয় ঘনত্বের কারণেই এমনটা হয়ে থাকে। এর ঘনত্ব প্রতি ঘনসেন্টিমিটারে 8×10¹³ থেকে 2×10¹⁵ পর্যন্ত হতে পারে।

পালসার

পালসার হলো প্রচণ্ড গতিতে ঘুরতে থাকা নিউট্রন স্টার। প্রচণ্ড ঘুর্ণনগতির কারণে পালসার থেকে স্পন্দনের মতো ক্ষণে ক্ষণে রেডিয়েশন নির্গত হয়। এর সর্বোচ্চ ঘুর্ণনগতি হতে পারে সেকেন্ডে ৭০০ বার!

বাইনারি স্টার সিস্টেম :

মহাবিশ্বের বেশিরভাগ নক্ষত্রই বাইনারি স্টার সিস্টেমের অন্তর্ভুক্ত। এদের কয়েকটি ক্যাটাগরি হলো :

  • ডবল স্টার
  • বাইনারি স্টার
  • এক্লিপ্স বাইনারি স্টার
  • এক্স-রে বাইনারি স্টার

ডবল স্টার

ডবল স্টার বা যুগল নক্ষত্র হলো এমন দুটো নক্ষত্র যারা একে অপরের খুব কাছাকাছি রয়েছে, এবং একে অপরকে ঘিরে চক্কর কাটছে। অনেক নক্ষত্রই এরকম দুই বা তারও বেশি নক্ষত্র দিয়ে গঠিত “স্টার সিস্টেম” এর অংশ। এর উজ্জ্বল নক্ষত্রটিকে মূখ্য নক্ষত্র এবং তার তুলনায় কম উজ্জ্বল নক্ষত্রটিকে গৌণ নক্ষত্র বলা হয়। কিছু কিছু নক্ষত্রকে পৃথিবী থেকে খালি চোখে দেখলে একটিমাত্র নক্ষত্র মনে হয়, কারণ তারা আমাদের সাপেক্ষে একই দৃষ্টিরেখায় অবস্থান করে। এদেরকে প্রকৃত যুগল নক্ষত্র বলা যায় না। কারণ পৃথিবী থেকে একসাথে দেখা গেলেও দুটো নক্ষত্রের মধ্যে অনেক দূরত্ব থাকতে পারে।

বাইনারি স্টার

বাইনারি স্টার হলো দুটো নক্ষত্রের এমন একটি “স্টার সিস্টেম” যেখানে দুটো নক্ষত্র একে অপরের সাধারণ ভরকেন্দ্রকে (ব্যারিসেন্টার) কেন্দ্র করে ঘোরে। মহাবিশ্বে মোট নক্ষত্রের অর্ধেকই হলো বাইনারি স্টার। আমাদের সুপরিচিত ধ্রুবতারা হচ্ছে এরকম বাইনারি স্টার সিস্টেমের দুটো নক্ষত্রের একটি, তাকে পৃথিবীর মেরু অক্ষ বরাবর দেখা যায়।

এক্লিপ্স বাইনারি স্টার

এক্লিপ্স বাইনারি হলো আরেক প্রকার বাইনারি নক্ষত্র সিস্টেম। এখানেও একটি মূখ্য নক্ষত্র এবং অপরটি গৌণ নক্ষত্র থাকে। তো, যখন মূখ্য নক্ষত্রটি গৌণ নক্ষত্রকে আংশিক আড়াল করে তখন উজ্জ্বলতা যতটা বাড়ে, এর উলটো ঘটনা ঘটলে উজ্জ্বলতা এরচেয়ে খানিকটা কম বাড়ে। আংশিক আড়াল হওয়ার কারণ হলো এই নক্ষত্র সিস্টেমের কক্ষপথটি এমনভাবে কাত হয়ে থাকে যাতে সবসময়ই তার অপর প্রান্ত দেখা যায়।

এক্স-রে বাইনারি স্টার

এক্স-রে বাইনারি স্টার হলো একটি বিশেষ ধরনের বাইনারি সিস্টেম যার একটি নক্ষত্রের কেন্দ্র সংকুচিত হয়ে হোয়াইট ডোয়ার্ফ, নিউট্রন স্টার বা ব্ল্যাক হোলে পরিণত হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে সংকুচিত কেন্দ্রের নক্ষত্রটিকে এক্রেটর বলা হয়, এবং স্বাভাবিক নক্ষত্রটিকে ডোনার বলা হয়। তো, এক্রেটরের তীব্র মহাকর্ষীয় আকর্ষণে ডোনার নক্ষত্র থেকে বিভিন্ন উপাদান এক্রেটরের দিকে ছুটে যায় এবং এক্রেটরের বুকে আছড়ে পড়ে। ফলাফল হিসেবে নির্গত হয় এক্স-রে।

ভ্যারিয়েবল স্টার বা বিষমতারা, যাদের উজ্জ্বলতায় তারতম্যের খেলা :

এরা সাধারণত দু ধরনের হয় :

  • ইন্ট্রিন্সিক ভ্যারিয়েবল স্টার
  • এক্সট্রিন্সিক ভ্যারিয়েবল স্টার

ইন্ট্রিন্সিক ভ্যারিয়েবল স্টার

এরা হলো সেইসব নক্ষত্র, যাদের গঠনে কিছুটা সমস্যা আছে, যেমন হতে পারে এর একপাশ উজ্জ্বল এবং অন্যপাশ অনুজ্জ্বল। তাই যখন এরকম তারার ঘুর্ণনের সাথে উজ্জ্বলতা বাড়ে কমে।

এক্সট্রিন্সিক ভ্যারিয়েবল স্টার

এদের কোনো শারিরীক সমস্যা নেই। তার আশেপাশের অন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তু তার সামনে দিয়ে প্রদক্ষিণের সময় নক্ষত্রটির আলো আমাদের চোখ পর্যন্ত আসতে বাধাপ্রাপ্ত হয়, এই কারণে আমরা নির্দিষ্ট সময় পরপর এর উজ্জ্বলতার তারতম্য দেখি।

ইন্ট্রিন্সিক ভ্যারিয়েবল স্টারদের ৪৫ টা ক্যাটাগরি উইকিপিডিয়াতে পেলাম। আর এক্সট্রিন্সিক ভ্যারিয়েবল স্টারদের ক্যাটাগরি পেলাম মোট ১৭ টি। এই সবগুলো ক্যাটাগরি নিয়ে লিখে আর্টিকেলটাকে মহাভারত বানানোর ইচ্ছে আমার নেই, তাই এখানেই ইতি টানলাম। অসীম ধৈর্য্য নিয়ে পুরো আর্টিকেলটা পড়ার জন্য আপনাকে একটা স্পেশাল থ্যাংকস।

                            Thank you

1 thought on “নক্ষত্র জগৎ”

  1. Pingback: মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি–৭, গ্র‍্যাভিটেশনাল লেন্সিং ও স্পেইস-টাইমের সম্প্রসারণ - অক্ষর

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *