রেড শিফট এবং ডপলার ইফেক্ট

মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি (৭ম পর্ব)
মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি (৭ম পর্ব)
  1. মহাবিশ্ব, এই যাত্রার শেষ কোথায়?
  2. মহাবিশ্ব মাপার ফিতে
  3. মিল্কিওয়ে: আমাদের নক্ষত্রবাড়ি
  4. অন্যান্য গ্যালাক্সিরা
  5. মহাবিশ্বের মহাবিন্যাস
  6. মহাবিশ্বের মহাপ্রসারণ এবং তরঙ্গ কথন
  7. রেড শিফট এবং ডপলার ইফেক্ট
  8. অলবার্সের প্যারাডক্স
  9. মহাবিশ্বের নানা মডেল
  10. মহাবিশ্বের গাণিতিক প্রকৃতি
  11. মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ

একটি গ্রাফ আছে, যা বিকিরণকে ‘Spectrum’ হিসেবে চিহ্নিত করে। ‘Spectrum’ বা বর্ণালী হচ্ছে একটি উৎস থেকে নির্গত আলোকছটা, যা স্পেকট্রোমিটারের সাহায্যে বিশ্লেষণ করে উৎসটির গাঠনিক উপাদান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। খুব সহজ ভাষায় স্পেকট্রোমিটার হচ্ছে এক ধরনের প্রিজম। নক্ষত্র, গ্যালাক্সি বা উত্তপ্ত লোহার টুকরা, সবকিছুরই আলাদা বৈশিষ্ট্যযুক্ত বর্ণালী আছে। নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি থেকে নির্গত বিকিরণের কিছুটা তাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা গ্যাসের মেঘপুঞ্জ দ্বারা শোষিত হয়। কোন কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষিত হবে সেটা নির্ভর করে গ্যাসীয় মেঘপুঞ্জে থাকা পদার্থের ধরনের ওপর। যেমন, ক্যালসিয়ামের পরমাণু একটি নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের তরঙ্গ শোষণ করতে পারে, বাকি তরঙ্গগুলো সে ইগ্নোর করে। আবার লোহার পরমাণু অন্য একটি নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের তরঙ্গ শোষণ করে বাকিগুলো ছেড়ে দেয়। কোন কোন পদার্থ কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষণ করে এগুলো ল্যাবরেটরিতেই পরীক্ষা করে বের করা যায়। নক্ষত্র বা গ্যালাক্সির গাঠনিক উপাদান কিছু নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যকে শোষণ করে ফেলে, ফলে স্পেকট্রোমিটারে সেইসব তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বর্ণালী দেখা যায় না, তার বদলে দেখা মেলে কালো কালো দাগ। এই দাগগুলো বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা বলে দিতে পারেন কোনো নক্ষত্রের বা গ্যালাক্সির বা যেকোনো মহাজাগতিক বস্তুর গাঠনিক উপাদান কী হতে পারে।

হাবল দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে নির্গত আলো নিয়ে বিস্তর ঘাঁটাঘাঁটি করলেন, এবং আলোর বর্ণালীতে সেই পরিচিত কালো দাগগুলো খুঁজে পেলেন। যার অর্থ, গ্যালাক্সিগুলো আমাদের চেনাজানা পদার্থ দিয়েই গঠিত, সুতরাং, চেনাজানা পদার্থদের মতো গ্যালাক্সিদেরও বর্ণালী বিশ্লেষণ করে এর গতিপ্রকৃতি পাওয়া যাবে। তিনি আরও লক্ষ করলেন গ্যালাক্সি থেকে নির্গত বিদ্যুচ্চৌম্বকীয় তরঙ্গগুলো ক্রমে লম্বা হয়ে লালের দিকে সরে যাচ্ছে। খুব মনোযোগ সহকারে অনেকগুলো গ্যালাক্সির বিদ্যুচ্চৌম্বকীয় তরঙ্গ পর্যবেক্ষণ করে তিনি বুঝলেন, ঘটনা সবদিকে একই! অর্থাৎ চতুর্দিকের গ্যালাক্সিগুলো থেকে আসা তরঙ্গগুলো ক্রমেই লম্বা হয়ে লালের দিকে সরে যাচ্ছে। হাবল ডপলার ইফেক্টের ওপর ভিত্তি করে শেষমেশ এই সিদ্ধান্তে এলেন যে, গ্যালাক্সিদের থেকে নির্গত বিকিরণের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের এই লাল সরণ ঘটার কারণ হলো গ্যালাক্সিগুলো আমাদের সাপেক্ষে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে।

বহির্জাগতিক বস্তু থেকে আসা আলোর বর্ণালীতে কালো দাগের উপস্থিতির কথা জ্যোতির্বিদরা বহু আগে থেকেই জানতেন। জার্মান পদার্থবিদ জোসেফ ভন ফ্র‍্যাউইনহোফার (১৭৮৭-১৮২৬) সূর্য থেকে আসা আলোর বর্ণালীতে এমন কালো দাগ খুঁজে পেয়েছিলেন। ইংরেজ রসায়নবিদ উইলিয়াম হাইড ওলাস্টনও (১৭৬৬-১৮২৮) ১৮০২ সালে উজ্জ্বল বস্তু থেকে বিকিরিত বর্ণালীতে কালো দাগের উপস্থিতি শনাক্ত করেছিলেন। ১৮৬৮ সালে ইংরেজ জ্যোতির্বিদ উইলহাম হাগিনস দেখিয়েছিলেন কিছু উজ্জ্বল নক্ষত্রের বর্ণালীর কালো দাগগুলি স্থির উৎসের বর্ণালীর মতো সাধারণ অবস্থানে না থেকে ক্রমেই লাল বা নীল তরঙ্গদৈর্ঘ্যের দিকে সরে যাচ্ছে। তিনি ডপলার ইফেক্টের সাহায্যে এর নিখুঁত ব্যাখ্যা দেন, বলেন–এর মানে হচ্ছে কিছু নক্ষত্র আমাদের থেকে দূরে সরছে, আবার কিছু নক্ষত্র আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। যেমন ব্রহ্মহৃদয় (Capella) নক্ষত্রটির বর্ণালীর কালো দাগগুলিতে সূর্যের তুলনায় ০.০১% লাল সরণ ঘটে, যার মানে হচ্ছে ব্রহ্মহৃদয় নক্ষত্রটি আমাদের থেকে আলোর বেগের ০.০১% গতিতে অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে ৩০ কিলোমিটার হারে দূরে সরে যাচ্ছে। পরবর্তীতে ডপলার ইফেক্টের সাহায্যে বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তু যেমন যুগল-নক্ষত্র বা শনির বলয়ের গতিবেগ বের করা হয়েছিল।

আলোকউৎস পর্যবেক্ষক সাপেক্ষে স্থির থাকলে হোয়াইট শিফট ঘটে, এগিয়ে এলে ব্লু শিফট ঘটে, এবং দূরে সরলে রেড শিফট ঘটে।

হাবল কীভাবে বুঝলেন একটি গ্যালাক্সির লাল সরণ দীর্ঘ হচ্ছে মানেই গ্যালাক্সিটি ততই দূরে সরছে? (এবং তার গতিবেগও তত বেশি হারে বাড়ছে)। তিনি যেসব গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন সেগুলোর বেশিরভাগই পৃথিবী থেকে খুবই অস্পষ্ট দেখায়। এদের লাল সরণও অনেক দীর্ঘ হয়, এখন সাধারণভাবে ধরে নেওয়া যায় : যে গ্যালাক্সি যত অনুজ্জ্বল সে ততই দূরে থাকবে। কিন্তু এখানেই মূল ঘাপলা, এমনও তো হতে পারে গ্যালাক্সিটিকে অস্পষ্ট দেখার কারণ হচ্ছে এটি অন্যদের চেয়ে কম আলোকিত? অথবা গ্যালাক্সিটি  ছোটো তাই অনুজ্জ্বল দেখাচ্ছে, শুধু গায়ে-গতরে বড়ো হওয়ার কারণে তার থেকে অনেক দূরের গ্যালাক্সিগুলোকে তার তুলনায় বেশ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে! এইজন্য হাবলকে বিভিন্ন ধরনের গ্যালাক্সি নিয়ে প্রচুর গবেষণা করতে হয়েছিল, এবং এমন সব গ্যালাক্সি বেছে নিতে হয়েছিল যেগুলো আমাদের থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে অবস্থিত, যেগুলো মোটামুটি একই পরিমাণ আলো বিকিরণ করে, অর্থাৎ যেগুলোর একটি নির্দিষ্ট উজ্জ্বলতা রয়েছে। এরকম গ্যালাক্সিগুলোকে ‘standard candles’ বলা হয় (বাংলায় বাতিঘর বলা যায়?), কারণ তাদের উজ্জ্বলতা থেকে তাদের দূরত্ব অনুমান করা যায়। ‘standard candles’ গ্যালাক্সি খুঁজে পাওয়া প্রচুর বিড়ম্বনার কাজ, যা এখনও নিখুঁতভাবে সমাধান করা যায়নি। যাহোক, হাবল এইভাবে দূরবর্তী গ্যালাক্সির ক্ষেত্রে লাল সরণ এবং আপাত উজ্জ্বলতার মাঝে একটা সম্পর্ক খুঁজে পেলেন। তারপর এগুলো বিশ্লেষণ করে পাওয়া গেল গ্যালাক্সির গতি এবং দূরত্ব।

Standard candles গ্যালাক্সি দ্বারা অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুর দূরত্ব নির্ণয় করা হয়।

উৎসের স্থানচ্যুতি ছাড়াও আরও বহু কারণে লাল সরণ ঘটতে পারে, উদাহরণস্বরূপ, আলো যদি কোনো অতিকায় ভারী বস্তুর পাশ দিয়ে আসে (যেমন কোনো নক্ষত্র) এবং পর্যবেক্ষক তুলনামূলক কম ভারী বস্তুর পাশে থেকে আলোটাকে পর্যবেক্ষণ করেন (যেমন পৃথিবী) তাহলেও পর্যবেক্ষক আলোর লাল সরণ দেখতে পেতে পারেন। একে বলে gravitational lensing. দূরবর্তী গ্যালাক্সিদের লাল সরণ কোনো গ্র‍্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের প্রভাবে ঘটছে না। কারণ, প্রথমত এই লাল সরণগুলি এরকম গ্র‍্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের (যেমন কোনো নক্ষত্রের) চাইতেও বিশাল বিস্তৃত হয়। দ্বিতীয়ত, গ্র‍্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের প্রভাব ধরে নিলে লাল সরণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ার পূর্বানুমানের সাথে পর্যবেক্ষণ করা তথ্যে গড়মিল আসে। সুতরাং বিশেষজ্ঞদের মতামত হলো : লাল সরণ গ্যালাক্সির স্থানচ্যুতির কারণেই ঘটছে, তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে মহাকর্ষ বা পদার্থবিদ্যার অন্য কোনো প্রক্রিয়ার সাহায্যে লাল সরণের বিকল্প ব্যাখ্যাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

গ্র‍্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের কারণে আলো বেঁকে যাওয়ায় একই কোয়াসারকে চারটি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় দেখা যাচ্ছে।

হাবলের আইন গ্যালাক্সির গতিবেগে কোনো লিমিট বসায় না, কারণ এই আইন অনুযায়ী একটি গ্যালাক্সির দূরত্ব অসীম হতে পারে। তো এটি কি আইনস্টাইন সাহেবের স্পেশাল রিলেটিভিটিকে বুড়ো আঙুল দেখায়? জ্যোতির্বিদরা লাল সরণের দৈর্ঘ্য বোঝাতে ইংরেজি z অক্ষরটি ব্যবহার করেন। z হচ্ছে তরঙ্গদৈর্ঘ্য সরণের ভগ্নাংশ, অর্থাৎ প্রাপ্ত তরঙ্গদৈর্ঘ্য ও মূল তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মধ্যেকার পার্থক্য। প্রাপ্ত তরঙ্গদৈর্ঘ্যকে মূল তরঙ্গদৈর্ঘ্য দ্বারা ভাগ দিলে z পাওয়া যায়। আলোর গতি ধ্রুব, তার তুলনায় গ্যালাক্সির বেগ অনেক কম, গ্যালাক্সির গতিবেগ হচ্ছে তার লাল সরণ অর্থাৎ z, এই z কে আলোর গতি c দিয়ে গুণ দিলে গ্যালাক্সির গতিবেগ cz পাওয়া যাবে। সুতরাং একটি গ্যালাক্সির লাল সরণ ০.১৫ হলে গতিবেগ হবে আলোর গতিবেগের ১৫% অর্থাৎ সেকেন্ডে ৪৫ হাজার কিলোমিটার। গ্যালাক্সির দূরত্ব যদি আলোর বেগের তিন ভাগের এক ভাগ হারেও বাড়ে তাহলেও লাল সরণ ওই গতিবেগকে ক্রস করে আমাদের নিকট আসতে পারবে না। যদিও অনেক দীর্ঘ লাল সরণ পর্যবেক্ষণ করা যায়, কিন্তু পর্যবেক্ষণের গতিও তো ওই আলোর গতিবেগ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। আমরা আলোর বেগের চাইতে দ্রুত তো আর পর্যবেক্ষণ করতে পারব না। প্রকৃতপক্ষে লাল সরণ যত অসীম হবে, গ্যালাক্সির বেগ ততই আলোর বেগের কাছাকাছি পৌঁছাবে। আলোর বেগ ও লাল সরণের মধ্যেকার সম্পর্কটি গ্রাফ এঁকে এভাবে দেখানো যায় :

যে পরিমাণ দূরত্বে গ্যালাক্সির লাল সরণ অসীম হয়ে যায় তাকে সাধারণত দিগন্ত (Horizon) বলা হয়। দিগন্তের ওপাশের গ্যালাক্সিগুলোকে পর্যবেক্ষণ করা যায় না। এর মানে কি এই নয় যে দিগন্তের ওপাশের গ্যালাক্সিগুলো আলোর চাইতে দ্রুতবেগে আমাদের থেকে সরে যাচ্ছে? হ্যাঁ ক্ষেত্রবিশেষে সেটা ঘটছে, কিন্তু সেটা বিভিন্ন কারণে স্পেশাল থিয়োরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য “কোনো বস্তুকণাই আলোর বেগের চেয়ে দ্রুততর হতে পারে না” এর সাথে সাংঘর্ষিক না। যেমন একটি কারণ হলো : স্পেশাল থিয়োরি অভ রিলেটিভিটিতে “মহাকর্ষ” বলতে কিছু নেই। যদিও মহাবিশ্বের সর্বত্র মহাকর্ষের টান কাজ করে, কিন্তু আলবার্ট আইনস্টাইনই (১৮৭৯-১৯৫৫) জেনারেল থিয়োরি অভ রিলেটিভিটি দ্বারা স্থান-কালের নতুন সংজ্ঞায়ন করে দেখিয়েছেন–মহাকর্ষ হচ্ছে জাস্ট স্পেইস-টাইমের “বক্রতা”র ফল। আর স্পেইস কোনো বস্তুকণা নয়, স্পেইসে ভেতর দিয়ে কোনো বস্তুকণা আলোর চেয়ে দ্রুতবেগে যেতে পারে না, কিন্তু স্পেইস ক্ষেত্রবিশেষে নিজে যে কোনো গতিতে সম্প্রসারিত হতে পারে। এই কারণেই আমাদের দৃষ্টিসীমার যে পয়েন্ট থেকে স্পেইস আলোর গতির চাইতে দ্রুত সরছে সেই পয়েন্টের ওপাশের অর্থাৎ হরাইজনের ওপাশের গ্যালাক্সিগুলোকে পর্যবেক্ষণ করা যায় না, যদিও আমরা সেগুলোর অস্তিত্ব অনুমান করতে পারি। মাধ্যাকর্ষণ সৃষ্টি হয় স্পেইসের “বক্রতা”র কারণে, যা একটি “বাঁকানো” স্পেইসের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে অবস্থিত দুজন পর্যবেক্ষকের মধ্যকার বেগের প্রচলিত ধারণাকে বদলে দেয়। দূরবর্তী গ্যালাক্সিদের গতিবেগ বের করার সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে লাল সরণ। সুতরাং আমরা বলতে পারি, লাল সরণ হরাইজনে গিয়ে অসীম হয়ে যায়, যা হরাইজনের ওপাশের গ্যালাক্সিগুলোর বর্তমান অবস্থানকে আমাদের কাছে অদৃশ্য করে তুলে।

 

(বিখ্যাত বাংলাদেশী বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম এর The ultimate fate of the universe বইয়ের বাংলা নির্যাস।)