মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি

মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি–৩, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি, আমাদের নক্ষত্রবাড়ি

পূর্ববর্তী লেখাটি না পড়ে থাকলে পড়ুন এখান থেকে- মহাবিশ্বের অন্তিম পরিনতি-২, মহাবিশ্ব মাপার ফিতে

রাতের পরিষ্কার আকাশ যেন সৌন্দর্যের এক অফুরন্ত ভান্ডার!

কী নেই সে আকাশে?

হাজার হাজার তারার নীলমণি যেন জ্বলছে-নিভছে!

একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, হালকা স্বচ্ছ মেঘের মতো একটা আলোকিত রাস্তা মধ্য আকাশের বুক চিরে বয়ে গেছে।

এটিই আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি

খালি চোখে দেখতে পাওয়া সকল জ্যোতিষ্ক আর সাধারণ টেলিস্কোপে চোখ রেখে পর্যবেক্ষণ করা সব নক্ষত্র এই মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির সদস্য।

অর্থ


ইংরেজি ‘গ্যালাক্সি’ শব্দটি গ্রিক শব্দ galaxias kyklos থেকে এসেছে। যার বাংলা করলে দাঁড়ায়–‘ছায়াপথ চক্র’। গ্রিক পুরান বলছে–দেবী জুনো যখন শিশু হারকিউলিক্সকে বুকের দুধ পান করাচ্ছিলেন, তখন জুনোর বুক থেকে খানিকটা দুধ ফিনকি দিয়ে ছড়িয়ে যায়, যার থেকে জন্ম হয় এই ছায়াপথটির।

গ্রিক মিথোলজি অনুযায়ী, দেবী জুনো শিশু হারকিউলিসকে দুধ পান করানোর সময় কিছু দুধ ফিনকি দিয়ে ছিঁটকে পড়ে, যা থেকে জন্ম হয় মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির

তাই এর নাম হয় Via Lactea. যার ইংরেজি প্রতিশব্দ Milky Way. আবার এদিকে Milky Wayর বাংলা পরিভাষা করা হয়েছে–আকাশগঙ্গা।

জন্ম

প্রায় ১৩৭৫ কোটি সাল আগের কথা। অকল্পনীয় তাপমাত্রা এবং অসহনীয় চাপে ঘটে যায় এক যুগান্তকারী ঘটনা, বিগব্যাং। বিগব্যাঙের ৩ মিনিট থেকে ১ লক্ষ বছরের মধ্যেই তৈরি হয়ে যায় হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম। এই দুটো পরমাণুসমৃদ্ধ মহাজাগতিক মেঘ তখন মহাশূন্যে ভেসে বেড়াচ্ছিল। ক্রমে মেঘের ভেতর মহাকর্ষের টানে বিভিন্ন জায়গায় দলা পাঁকিয়ে বিলিয়ন বিলিয়ন বুদ্বুদের সৃষ্টি হয়। অসহনীয় চাপে বুদ্বুদগুলোতে মিনিমাম ১০ মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উৎপন্ন হতেই হাইড্রোজেন পরমাণু ভেঙে হিলিয়ামে পরিণত হতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘নিউক্লিয়ার ফিউশন’। এই নিউক্লিয়ার ফিউশনে বিপুল পরিমাণ শক্তি নিঃসৃত হয়। বুদ্বুদগুলো পরিণত হয় যেন একেকটা জ্বলন্ত নক্ষত্রে। এই বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্র সমেত বিশাল মেঘপুঞ্জই আজকের ‘গ্যালাক্সি’।, ঘুর্ণন গতির ওপর নির্ভর করে গ্যালাক্সিগুলো বিভিন্ন আকার পায়। যেসব গ্যালাক্সিগুলোর নিজ অক্ষের ওপর ঘুর্ণন বেগ বেশি, সেগুলো হয়ে যায় চ্যাপটা থালার মতো। বাকিগুলোও ঘুর্ণনবেগের ওপর নির্ভর করে কোনোটা ডিমের মতো, কোনোটা প্যাঁচানো, কোনোটা সর্পিল, কোনোটা আবার র‍্যান্ডম–এরকম বিভিন্ন আকার লাভ করে।
দৃশ্যমান মহাবিশ্বে এরকম প্রায় ২০০ বিলিয়ন গ্যালাক্সি আছে। যার মধ্যে একটি হলো আমাদের এই মিল্কিওয়ে। মিল্কিওয়ে একটি সর্পিলাকার (স্পাইর‍্যাল) গ্যালাক্সি। টেবিল ফ্যানের ব্লেডের মতো এর কয়েকটা বাঁকানো বাহু রয়েছে। বাহুগুলোর সংখ্যা নিয়ে মতভেদ আছে। যাইহোক, এখানে প্রধান পাঁচটি বাহুর নাম দিচ্ছি :

• Norma arm
• Sagittarius arm
• Perseus arm
• Scutum-Centaurus arm
• Outer arm

আমাদের সৌরজগৎ রয়েছে মিল্কিওয়ের তুলনামূলক ছোটো একটি বাহু বা ‘স্পার’ এ। এর নাম Orion spur.

কী এই মিল্কিওয়ে?

ছবি: মিল্কিওয়ের মানচিত্র, প্রধান বাহুগুলো এবং মিল্কিওয়েতে সূর্যের অবস্থান ও কক্ষপথ

মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিটি চাকতি বা হার্ডডিস্কের মতো ফ্ল্যাট। অকল্পনীয় বিশাল দূরত্ব এই গ্যালাক্সির এ মাথা থেকে ও মাথায়। আলোর বেগে ভ্রমণ করলেও অন্য প্রান্তে পৌঁছাতে প্রায় ১ লক্ষ আলোকবর্ষ লেগে যাবে। পুরুত্বও সেইরকম সাংঘাতিক, সর্বসাকুল্যে ১ হাজার আলোকবর্ষ! মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে আনুমানিক ১০০ থেকে ৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র আছে। সূর্য হচ্ছে এগুলোর মাঝে মধ্যবিত্ত এক নক্ষত্র। এই নক্ষত্রগুলোর কোনোটার চারপাশে কিছু মহাজাগতিক বস্তু চক্কর দিচ্ছে। যেমন আমাদের সূর্যের চারপাশে চক্কর দিচ্ছে সাতটি মূলধারার গ্রহ, প্রচুর গ্রহাণুপুঞ্জ এবং ধূমকেতু। গ্রহের চারপাশে চক্কর দিচ্ছে আবার উপগ্রহগুলো। এই যে একটি নক্ষত্রকে ঘিরে বিশাল আয়োজন, একে প্ল্যানেটারি সিস্টেম বা গ্রহব্যাবস্থা বলে। আর বিশেষ করে আমাদের সূর্য ও এর চারপাশের এই আয়োজনকে সোলার সিস্টেম বা সৌরজগৎ বলে। অনেক সিস্টেমে দুটো নক্ষত্র থাকে, যারা একে অপরকে ঘিরে পাক খায়। এটাকে বাইনারি সিস্টেম বলে। মিল্কিওয়েতে বেশিরভাগই বাইনারি সিস্টেম।

ছবি: মিল্কিওয়ের দৈর্ঘ্য

আমাদের বৃহস্পতি গ্রহ আরেকটু বড়ো হলে সৌরজগতও বাইনারি সিস্টেম হয়ে যেতো। জ্যোতির্বিদরা আমাদের মিল্কিওয়েতে এ পর্যন্ত ৫০০টি গ্রহব্যাবস্থা চিহ্নিত করেছেন। এবং তারা ধারণা করছেন আমাদের মিল্কিওয়েতে ১০ থেকে ১০০ বিলিয়ন গ্রহব্যাবস্থা থাকতে পারে।

কেন্দ্রীয় ব্ল্যাকহোল কার্যালয় :

এখন কথা হচ্ছে এই যে সোলার সিস্টেম, প্ল্যানেটারি সিস্টেম বা বাইনারি সিস্টেম যা-ই বলিনা কেন, এগুলো কিন্তু স্থির হয়ে বসে নেই। আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রে আছে এক দানবীয় ব্ল্যাকহোল স্যাজিট্যারিয়াস এ*।

ছবি: কেন্দ্রীয় ব্ল্যাকহোল Sagittarius A* এর কার্যালয়

দানবটা প্রায় ৪২ লক্ষ সৌরভরের সমান ভর নিয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে জেঁকে বসে আছে । পুরো গ্যালাক্সির সব নক্ষত্র তাদের সিস্টেম সমেত এই ব্ল্যাকহোলটিকে ঘিরে চক্কর দিচ্ছে। এই ব্ল্যাকহোল থেকে আমাদের সৌরজগতের দূরত্ব প্রায় ২৭ হাজার আলোকবর্ষ! এবং আমাদের সৌরজগৎ এই ব্ল্যাকহোলটিকে এক পাক ঘুরে আসতে সময় নেয় মাত্র(!) ২৪ কোটি বছর! মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিটি সেকেন্ডে ২৫৪ কিলোমিটার বেগে নিজ অক্ষের ওপর ঘুরছে। তুলনামূলক ঘন বসতিপূর্ণ হওয়ায়, ব্ল্যাকহোলের নিকটবর্তী এলাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং বৃদ্ধ নক্ষত্ররা বাস করে। মিল্কিওয়ের সবচেয়ে বৃদ্ধ নক্ষত্র হচ্ছে Cayrel’s Star. আর এই বুইড়ার বয়স আনুমানিক সাড়ে বারো বিলিয়ন বছর।

পরবর্তী লেখাটি পড়তে পারেন এখানে- মহাবিশ্বের অন্তিম পরিনতি-৪, অ্যান্ড্রোমিডা, গ্যালাক্সিপাড়ার বড়দি

1 thought on “মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি–৩, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি, আমাদের নক্ষত্রবাড়ি”

  1. Pingback: মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি–৪, অ্যান্ড্রোমিডা, গ্যালাক্সিপাড়ার বড়দি - অক্ষর

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *