মিল্কিওয়ে: আমাদের নক্ষত্রবাড়ি

মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি (৩য় পর্ব)
মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি (৩য় পর্ব)
  1. মহাবিশ্ব, এই যাত্রার শেষ কোথায়?
  2. মহাবিশ্ব মাপার ফিতে
  3. মিল্কিওয়ে: আমাদের নক্ষত্রবাড়ি
  4. অন্যান্য গ্যালাক্সিরা
  5. মহাবিশ্বের মহাবিন্যাস
  6. মহাবিশ্বের মহাপ্রসারণ এবং তরঙ্গ কথন
  7. রেড শিফট এবং ডপলার ইফেক্ট
  8. অলবার্সের প্যারাডক্স
  9. মহাবিশ্বের নানা মডেল
  10. মহাবিশ্বের গাণিতিক প্রকৃতি
  11. মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ

জোৎস্ন্যাবিহীন রাতের পরিষ্কার আকাশ যেন সৌন্দর্যের এক অফুরন্ত ভান্ডার! কী নেই সে আকাশে? হাজার হাজার তারার নীলমণি যেন জ্বলছে-নিভছে! একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, হালকা স্বচ্ছ মেঘের মতো একটা আলোকিত রাস্তা মধ্য আকাশের বুক চিরে বয়ে গেছে। এটিই আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি। খালি চোখে দেখতে পাওয়া সকল জ্যোতিষ্ক আর সাধারণ টেলিস্কোপে চোখ রেখে পর্যবেক্ষণ করা সব নক্ষত্র এই মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির সদস্য।

ইংরেজি ‘গ্যালাক্সি’ শব্দটি গ্রিক শব্দ galaxias kyklos থেকে এসেছে। যার বাংলা করলে দাঁড়ায়–‘ছায়াপথ চক্র’। গ্রিক পুরান বলছে–দেবী জুনো যখন শিশু হারকিউলিক্সকে বুকের দুধ পান করাচ্ছিলেন, তখন জুনোর বুক থেকে খানিকটা দুধ ফিনকি দিয়ে ছড়িয়ে যায়, যার থেকে জন্ম হয় এই ছায়াপথটির। তাই এর নাম হয় Via Lactea. যার ইংরেজি প্রতিশব্দ Milky Way. আবার এদিকে Milky Wayর বাংলা পরিভাষা করা হয়েছে–আকাশগঙ্গা।

মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিটি চাকতি বা ডিস্কের মতো ফ্ল্যাট। অকল্পনীয় বিশাল দূরত্ব এই গ্যালাক্সির এ মাথা থেকে ও মাথায়। আলোর বেগে ভ্রমণ করলেও অন্য প্রান্তে পৌঁছাতে প্রায় ১  লক্ষ আলোকবর্ষ লেগে যাবে। পুরুত্বও সেইরকম সাংঘাতিক, সর্বসাকুল্যে ১ হাজার আলোকবর্ষ! গ্যালাক্সিটির চাকতিকে ঘিরে আরও ১ লক্ষ আলোকবর্ষ ব্যাসের একটি গোলাকার “হ্যালো” রয়েছে, এই হ্যালোতে নক্ষত্রের সংখ্যা অবশ্যি চাকতির চেয়ে প্রচুর কম। খুব সম্ভবত ইংলিশ যন্ত্রনির্মাতা থমাস রাইট ১৭৫০ সালে তাঁর বই Original theory or new hypothesis of the universe এ সর্বপ্রথম ধারণা দেন যে : মিল্কিওয়ের নক্ষত্রগুলো একটি সমতল উঠোন বরাবর ছড়িয়ে রয়েছে, এবং এই উঠোনটির চারপাশ ঘিরে একটি গোলাকার চাকতি লক্ষ্য করা যায়।

The Origin of the Milky Way চিত্রশিল্পি: Peter Paul Rubens গ্রিক মিথোলজি অনুযায়ী, দেবী জুনো শিশু হারকিউলিসকে দুধ পান করানোর সময় কিছু দুধ ফিনকি দিয়ে ছিঁটকে পড়ে, যা থেকে জন্ম হয় মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির।

আমরা যদি একটি সাধারণ টেলিস্কোপ দিয়েও আকাশকে পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে অজস্র নক্ষত্র ও মিল্কিওয়ের পাশাপাশি কিছু অস্পষ্ট মেঘের মতো বস্তু দেখতে পাবো। ১৭৮১ সালে চার্লস মেসিয়ের নামক একজন ফরাসি জ্যোতির্বিদ ও ধূমকেতু পর্যবেক্ষক ১০৩ টি জ্যোতির্ময় বস্তু চিহ্নিত করেন যাতে করে অন্য কেউ এগুলোকে ধূমকেতু ভেবে ভুল না করে। এই তালিকাকে ‘মেসিয়েরের তালিকা’ বলা হয়। আজও জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মেসিয়েরের সম্মানে এই তালিকায় উল্লেখিত বস্তুগুলোকে M দিয়ে চিহ্নিত করেন এবং মূল তালিকার অবস্থান অনুযায়ীই এটির ক্রম নির্ধারণ করেন। উদাহরণস্বরূপ, ক্র‍্যাব নেবুলা হচ্ছে মেসিয়েরের তালিকায় উল্লেখিত প্রথম বস্তু M1, যাকে একটি বিস্ফোরিত নক্ষত্রের ফসিল বলা চলে।

ক্র‍্যাব নেবুলা ক্রেডিট: ESA/Herschel/PACS/MESS Key Programme Supernova Remnant Team

জার্মানীতে জন্মগ্রহণ করা ইংরেজ জ্যোতির্বিজ্ঞানী উইলিয়াম হার্শেল (১৭৩৮-১৮২২) এবং তাঁর ছেলে জন হার্শেল (১৭৯২-১৮৭১) মেসিয়েরের তালিকায় “নেবুলাই” নামে কিছু নতুন বস্তু যোগ করেন। উইলিয়াম হার্শেল মূলত একজন সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন! কিন্তু সেই তিনিই ১৭৮১ সালে ইউরেনাস গ্রহ আবিষ্কার বসেন! সেইসাথে তিনি ২০০০ টির মতো “নেবুলাই” এর তালিকাও তৈরি করে ফেলেন। বলাই বাহুল্য তৎকালীন জ্যোতির্বিদ্যাকে তিনি এক ধাক্কায় অনেকদূর এগিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর ছেলে জন হার্শেল বাবার দেখানো পথেই হাঁটেন এবং ১৮৬৪ সালে The General Catalogue of Nebulae প্রকাশ করেন, যা ছিল মোট ৫০৭৯ টি অস্পষ্ট বস্তুর একটি তালিকা। ড্যানিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী জন লুইস ড্রেয়ার (১৮৫২-১৯২৬) ১৮৮৮ সালে New General Catalogue ofNebulae and Clusters ofStars প্রকাশ করে এই তালিকাকে আরও দীর্ঘ করেন (তালিকাটিকে ১৮৯৫ এবং ১৯০৮ সালে আবার হালনাগাদও করা হয়) সে যাইহোক, ১৯৫০ সালের শেষের দিকে এই তালিকায় মোট অস্পষ্ট বস্তুর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৫ হাজার! কোনো অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই উনারা কেবল সাধারণ টেলিস্কোপে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চোখ রেখে এই বস্তুগুলো চিহ্নিত করেছিলেন! ভাবা যায়?

মেসিয়েরের তালিকার বেশিরভাগ বস্তুগুলোই আমাদের মিল্কিওয়ের ভেতরের বস্তু, যার মধ্যে অনেকগুলো “স্টার ক্লাস্টার” বা নক্ষত্রপুঞ্জ আছে প্রচুর নক্ষত্র দিয়ে ঠাসা, দূর থেকে এগুলোকে অস্পষ্ট মেঘের মতো দেখায়। এদের আবার দুটো গ্রুপ রয়েছে :

  • “ওপেন ক্লাস্টারস”, যেগুলোতে কয়েকশত নক্ষত্র দলবদ্ধ হয়ে ঠাসাঠাসি করে থাকে। যেমন ওপেন ক্লাস্টার M67 (মেসিয়েরের তালিকার ৬৭ নং বস্তু), কর্কট তারামণ্ডলে এর দেখা মেলে।
  • এবং “গ্লোবুলার ক্লাস্টারস”, এই ঘনবসতিপূর্ণ ক্লাস্টারগুলোতে প্রায় ১ লক্ষ নক্ষত্র গণহারে বাস করে। এরকম একটি ক্লাস্টার হচ্ছে M5, যাকে সর্পমণ্ডলে দেখা যায়।
হাবল টেলিস্কোপে তোলা একটি নক্ষত্রপুঞ্জ (Star Cluster) ক্রেডিট: ESA

ড্রেয়ারের প্রতি সম্মান প্রদর্শনপূর্বক এই দুটো মহাজাগতিক বস্তুকে যথাক্রমে NGC2682 এবং NGC5904 নামেও ডাকা হয়, এই সংখ্যাগুলো হচ্ছে ড্রেয়ারের নতুন তালিকায় এদের অবস্থানের ক্রম।

নক্ষত্রপুঞ্জের পাশাপাশি মেসিয়ারের তালিকায় কিছু “নেবুলাই”ও রয়েছে, যেগুলো মূলত নেবুলা। নেবুলাগুলো সাধারণত মহাজাগতিক ধূলিকণা ও গ্যাস দিয়ে গঠিত হয়। গ্যালাক্সির বিভিন্ন জায়গায় এসব ধূলিকণা ও গ্যাস জড়ো হয়ে প্রাথমিক নক্ষত্র গঠন করার প্রক্রিয়া চলমান রাখে। ওরিয়ন নেবুলা (M42 or NGC1976) হচ্ছে এরকম একটি নেবুলা, কালপুরুষ নক্ষত্রমণ্ডলে একে খালি চোখেই দেখা যায়।

মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির সর্পিল বাহুগুলো এবং মিল্কিওয়েতে সূর্যের অবস্থান ও কক্ষপথ

ছবিতে আমরা একটি সর্পিল আকারের গ্যালাক্সি দেখতে পাচ্ছি। এটিই আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি, আমাদের নক্ষত্রবাড়ি! এই সর্পিলাকার গ্যালাক্সিটি চ্যাপটা থালার মতো আকৃতি নিয়ে তার কেন্দ্রের চারপাশে ঘুরছে। গ্যালাক্সিটির ভেতরে কেন্দ্রের নিকটবর্তী অঞ্চলে পদার্থের ঘনত্ব সবচাইতে বেশি, এই অংশটি গ্যালাক্সির পরিধির চাইতে অনেক দ্রুত ঘোরে। এই চ্যাপ্টা চাকতিটির মাঝামাঝি অংশে, যেখানে সূর্য সহ পর্যবেক্ষণযোগ্য প্রায় বেশিরভাগ নক্ষত্র অবস্থান করে, সেখানকার কৌণিক বেগ কেন্দ্রের কৌণিক বেগের তুলনায় অনেক কম। অর্থাৎ কেন্দ্র থেকে একটা নক্ষত্র যত দূরে অবস্থান করে তার গ্যালাক্সিকে প্রদক্ষিণ করার বেগ তত ধীর হয়, অনেকটা আমাদের সৌরজগতের গ্রহগুলোর মতোই। যাহোক, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির চারপাশে সূর্যের ঘুর্ণনবেগ হচ্ছে সেকেন্ডে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার, এই বেগে গ্যালাক্সির চারপাশ একবার ঘুরে আসতে সূর্যের সময় লাগে প্রায় ২০০ মিলিয়ন বছর।

গ্যালাক্সির কেন্দ্রটি গ্যাস ও ধুলাবালি দ্বারা পরিপূর্ণ, যার কারণে একে দৃশ্যমান পর্যবেক্ষণ করা যায় না। তবে সেখান থেকে আসা রেডিয়ো তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে কেন্দ্রটির ভেতরের গঠনপ্রণালী সম্পর্কে বেশকিছু তথ্য পাওয়া গেছে। গ্যালাক্সির কেন্দ্রে আছে এক দানবীয় ব্ল্যাকহোল স্যাজিট্যারিয়াস এ*।

দানবটা প্রায় ৪২ লক্ষ সৌরভরের সমান ভর নিয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে জেঁকে বসে আছে । পুরো গ্যালাক্সির সব নক্ষত্র তাদের সিস্টেম সমেত এই ব্ল্যাকহোলটিকে ঘিরে চক্কর দিচ্ছে। এই ব্ল্যাকহোল থেকে আমাদের সৌরজগতের দূরত্ব প্রায় ২৭ হাজার আলোকবর্ষ! তুলনামূলক ঘন বসতিপূর্ণ হওয়ায়, ব্ল্যাকহোলের নিকটবর্তী এলাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং বৃদ্ধ নক্ষত্ররা বাস করে। মিল্কিওয়ের সবচেয়ে বৃদ্ধ নক্ষত্র হচ্ছে Cayrel’s Star. এই নক্ষত্রের বয়স আনুমানিক সাড়ে বারো বিলিয়ন বছর।

কেন্দ্রীয় ব্ল্যাকহোল Sagittarius A*

গ্যালাক্সিটির কেন্দ্রের বেশিরভাগ পদার্থই বিভিন্নরকম নক্ষত্রের অংশবিশেষ, গ্যালাক্সিতে মোট নক্ষত্রের সংখ্যা আনুমানিক ১০০ থেকে ৪০০ বিলিয়ন, এছাড়াও রয়েছে প্রচুর আন্তঃজাগতিক ধুলাবালি ও গ্যাসের মেঘ। আগ্রহের ব্যাপার হচ্ছে এইসব আন্তঃজাগতিক পদার্থগুলোতে অজৈব যৌগের পাশাপাশি জৈব যৌগের উপস্থিতিও পাওয়া গেছে! এই ইন্টারেস্টিং ব্যাপার নিয়ে ইদানীং প্রচুর গবেষণাও হচ্ছে। তবে সেটা অন্য আলোচনার বিষয়। আবার পৃথিবীর মতো গ্যালাক্সিরও একটি নিজস্ব মহাশক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র রয়েছে। উপযুক্ত পর্যবেক্ষণের অভাবে গ্যালাক্সির একেবারে নিখুঁত বর্ণনা দেওয়াটা যদিও কঠিন, কিন্তু মহাবিশ্বের বিশাল পরিসর নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এসব ক্ষুদ্র(!) বিষয়ের খুঁটিনাটি বর্ণনা করাটা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।

(বিখ্যাত বাংলাদেশী বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম এর The ultimate fate of the universe বইয়ের বাংলা নির্যাস।)