মহাকর্ষ, মহাজাগতিক বস্তুমাত্রই কি কলুর বলদ?

ছবির মতো ছিমছাম সবকিছু, সবাই নিজ নিজ কক্ষপথে বিরতিহীন ঘুরে চলেছে। উপগ্রহ ঘুরছে গ্রহকে ঘিরে, গ্রহ ঘুরছে নক্ষত্রকে ঘিরে। নক্ষত্রও ঘুরছে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলকে ঘিরে। আসলেই মহাবিশ্বের স্ট্রাকচার এত নিখুঁত হলো কীভাবে? বা আমরা যতটা নিখুঁত ভাবছি আদৌ কি মহাবিশ্ব ততটাই নিখুঁত? চলুন এটা নিয়ে আজ আলোচনা করি…

 

ঘানি টানা দেখেছেন নিশ্চয়ই? গরুর কাঁধে একটা জোয়াল বসিয়ে ঘানির সাথে বেঁধে দেওয়া হয়, তারপর গরুটা ঘানির চারপাশে ঘুরতে থাকে। যারা গরু দিয়ে ঘানি টানিয়ে তেলবীজ থেকে তেল আলাদা করে, এদের বলা হয় কলু। আর ঘানি টানার গরুকে বলা হয় কলুর বলদ। তো, কলুর বলদ ঘানির সাথে বাঁধা অবস্থায় যদি সোজা চলতে চায় তারপরও জোয়ালের সাথে বাঁধা থাকার কারণে সে গোল হয়ে ঘানির চারপাশেই ঘুরতে থাকবে। প্রায় একই ব্যাপার ঘটছে মহাবিশ্বে। জাস্ট এইভাবে চিন্তা করেন, প্রত্যেকটা উপগ্রহ হচ্ছে গ্রহের কাছে কলুর বলদ। গ্রহ হচ্ছে নক্ষত্রের কাছে কলুর বলদ। এবং নক্ষত্র হচ্ছে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের কাছে কলুর বলদ। আর এই ‘বলদ’দের কাঁধে যে অদৃশ্য ‘জোয়াল’ চাপানো আছে সেটাই মহাকর্ষ।

 

কত সুন্দর করে মহাজাগতিক বস্তুরা একে অপরের চারপাশে ঘুরছে! কোনো বিশৃঙ্খলা নেই, কোনো ঠোকাঠুকি নেই! সবকিছু ছবির মতো ছিমছাম, সাজানো গোছানো। আসলেই কি তাই? চলুন ফিরে যাই অতীতে, আদিম মহাবিশ্বে। প্রথমে উদাহরণ দিয়ে বোঝাই :

 

শুরু হয়েছে মহাজাগতিক লুডুখেলা, গুটি বেশি হলে মারা পড়ার চান্স বেশি, তাই সমানে গুটি মারা পড়তে লাগল। এভাবে সাফসুতরো হয়ে লক্ষকোটি বছরের পরিক্রমায় যেসব গুটি অবশিষ্ট থাকলো, তাদের অবস্থা এমন দাঁড়ালো যে, এক গুটি অন্য ঘুটির নাগাল পাচ্ছে না। ঠিক এমন সময় এই লুডোখেলায় আমরা দর্শক হিসেবে হাজির হলাম, এবং মন্তব্য করে বসলাম : ওয়াও! কী নিখুঁত ডিজাইন করা লুডু! সবাই নিজ নিজ চাল চালছে, কিন্তু এক গুটি অন্য গুটির নাগালই পাচ্ছে না! এটা তো ন্যাচারালি সম্ভব না! আসলেই কি সম্ভব না? উত্তর তো পেয়েই গেলেন!

 

উদাহরণ দিলাম, এবার বাস্তবে ফিরি…

 

আদিম মহাবিশ্ব, গ্যাস-ধূলিকণার মেঘ ঘনীভূত হয়ে প্রাকৃতিক ফোর্সগুলোর নানা ক্রিয়া-বিক্রিয়ায় জন্ম নিচ্ছে লক্ষ কোটি গ্যালাক্সি। আশেপাশের ছুটন্ত সবকিছুকে মহাকর্ষের সাহায্যে টেনে নিচ্ছে নিজের উদরে। ফলে বাড়ছে ভর, সেইসাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তাপ ও চাপ। এই গ্যালাক্টিক মেঘগুলোর ভেতরও কোটি কোটি বুদ্বুদ ফিউশন ঘটানোর জন্য তৈরি হচ্ছে। এরা ভবিষ্যতের নক্ষত্র। এরাও সাধ্যমতো নিজের চারপাশে থাবা বসাচ্ছে, আর যা পাচ্ছে উদরে টেনে নিচ্ছে। মহাকর্ষের প্রভাবে সব হবু নক্ষত্র গ্যালাক্সির কেন্দ্রকে ঘিরে ঘুরতে শুরু করল, একই ঘটনা ঘটল নিজের সাপেক্ষেও। মানে হবু নক্ষত্ররা নিজ কেন্দ্রকে ঘিরেও ঘুরতে লাগল।

A Child Star (Protoster), Credit: NASA / JPL-Caltech
একটি শিশু নক্ষত্র(প্রোটোস্টার), Credit: NASA / JPL-Caltech

যতই ঘোরাঘুরি বাড়তে লাগল ততই বাড়তে লাগল ঠোকাঠুকি বা সংঘর্ষ। এই সংঘর্ষে কত কত হবু নক্ষত্রের জীবনাবসান হলো তার ইয়ত্তা নেই। যারা একটু বড়ো হবু নক্ষত্রের সাথে ধাক্কা খেয়েছিল তারা শতখণ্ড ভেঙে চুরমার হয়ে পরাধীনতার শেকলে আটকা পড়ল। হয়ে গেল কলুর বলদ! এভাবে কিছু নক্ষত্রের চারপাশে তৈরি হলো গ্রহ। এদেরও চলার পথ মসৃণ ছিল না। তাই ঠোকাঠুকি অব্যাহত থাকল। কিছু গ্রহ ভেঙেচুরে অন্য গ্রহের উপগ্রহ হয়ে বেঁচে রইল। এইভাবে কোটি কোটি বছরের সংঘর্ষে নিজ কক্ষপথ সাফ করে যারা সার্ভাইভ করে রইল তারাই টিকে গেল। ন্যাচারাল সিলেকশন এখানেও খাটে দেখছি!!!

 

আবার কিছু নক্ষত্র অন্য আরেকটা নক্ষত্রের সাথে গ্র‍্যাভিটির বন্ধনে জড়িয়ে গেল।ঘটনার এখানেই ইতি হলো না। সদ্য জন্ম নেওয়া গ্রহগুলোর মাঝেও তুমুল সংঘর্ষ দেখা দিলো। কলুর বলদের উদাহরণটা এখানে আবার নিয়ে আসি। কিছু গ্রহরূপী কলুর বলদের ঘোরার স্পিড বেশি ছিল, তাই জোয়াল ভেঙে ঘানি থেকে মুক্ত হয়ে দিগ্বিদিক ছুটল। আবার কিছু গ্রহরূপী কলুর বলদের গায়ে এত জোর ছিল না, ধীরে ঘুরত, ফলশ্রুতিতে কিছুদিন ঘানি টেনে ওরা ক্লান্ত হয়ে মারা পড়ল। বাকি রইল কেবল সেই সমস্ত কলুর বলদ, যারা মোটামুটি সাম্যাবস্থায় থেকে নিরন্তর ঘুরতে পারে।

 

মোটামুটি বললাম কেন? কারণ জগতে কোনোকিছুই শতভাগ নিখুঁত হয় না। আমাদের সৌরজগতের কথাই যদি ধরি, দেখা যাবে একেবারে নিখুঁত কক্ষপথ কারো নেই, হয় কেউ অতি ধীরে সূর্যের দিকে আগাচ্ছে, নয়তো সূর্য থেকে সরছে। এতই ধীর যে এক ইঞ্চি এদিক সেদিক হতেও লক্ষ লক্ষ বছর লেগে যায়। আমাদের ৬০-৭০ বছরের খুব ক্ষুদ্র জীবনে তাই আমরা একটা মহাবিশ্বকে নিখুঁত দেখি। বোঝা গেল ব্যাপারটা?

Remote Planetary System
কক্ষপথের শত প্রতিকূলতা জয় করে
যারা টিকে থাকার তারা টিকে গেছে।
ক্রেডিট: 1981willy at English Wikipedia.

যদি সত্যিই এই পোস্টের সবকিছু বুঝে থাকেন তাহলে স্যার আইজ্যাক নিউটনকে একটা ধন্যবাদ দিন।