মহাবিশ্বের প্রতীকী ছবি

মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি–৭, গ্র‍্যাভিটেশনাল লেন্সিং ও স্পেইস-টাইমের সম্প্রসারণ

পূর্ববর্তী লেখাটি না পড়ে থাকলে পড়তে পারেন এখানে- মহাবিশ্বের অন্তিম পরিনতি-৬, রেড শিফট ও তরঙ্গ কথন

বহির্জাগতিক বস্তু থেকে আসা আলোর বর্ণালীতে কালো দাগের উপস্থিতির কথা জ্যোতির্বিদরা বহু আগে থেকেই জানতেন।

জার্মান পদার্থবিদ জোসেফ ভন ফ্র‍্যাউইনহোফার (১৭৮৭-১৮২৬) সূর্য থেকে আসা আলোর বর্ণালীতে এমন কালো দাগ খুঁজে পেয়েছিলেন।

ইংরেজ রসায়নবিদ উইলিয়াম হাইড ওলাস্টনও (১৭৬৬-১৮২৮) ১৮০২ সালে উজ্জ্বল বস্তু থেকে বিকিরিত বর্ণালীতে কালো দাগের উপস্থিতি শনাক্ত করেছিলেন।

১৮৬৮ সালে ইংরেজ জ্যোতির্বিদ উইলহাম হাগিনস দেখিয়েছিলেন কিছু উজ্জ্বল নক্ষত্রের বর্ণালীর কালো দাগগুলি সূর্যের বর্ণালীর মতো সাধারণ অবস্থানে না থেকে ক্রমেই লাল বা নীল তরঙ্গদৈর্ঘ্যের দিকে সরে যাচ্ছে। তিনি ডপলার ইফেক্টের সাহায্যে এর নিখুঁত ব্যাখ্যা দেন।

বলেন–এর মানে হচ্ছে কিছু নক্ষত্র আমাদের থেকে দূরে সরছে, আবার কিছু নক্ষত্র আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে।

যেমন ব্রহ্মহৃদয় (Capella) নক্ষত্রটির বর্ণালীর কালো দাগগুলিতে সূর্যের তুলনায় ০.০১% লাল সরণ ঘটে, যার মানে হচ্ছে ব্রহ্মহৃদয় নক্ষত্রটি আমাদের থেকে আলোর বেগের ০.০১% গতিতে অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে ৩০ কিলোমিটার হারে দূরে সরে যাচ্ছে।

পরবর্তীতে ডপলার ইফেক্টের সাহায্যে বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তু যেমন যুগল-নক্ষত্র বা শনির বলয়ের গতিবেগ বের করা হয়েছিল।

ছবি : একটি নক্ষত্রের গতির দিকের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সরণ ঘটতে পারে

হাবল কীভাবে বুঝলেন একটি গ্যালাক্সির লাল সরণ দীর্ঘ হচ্ছে মানেই গ্যালাক্সিটি ততই দূরে সরছে? (এবং তার গতিবেগও তত বেশি হারে বাড়ছে)।

কারণ তিনি যেসব গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন সেগুলোর বেশিরভাগই পৃথিবী থেকে খুবই অস্পষ্ট দেখায়। এদের লাল সরণও অনেক দীর্ঘ হয়, এখন সাধারণভাবে ধরে নেওয়া যায় : যে গ্যালাক্সি যত অনুজ্জ্বল সে ততই দূরে থাকবে।

কিন্তু এখানেই মূল ঘাপলা, এমনও তো হতে পারে গ্যালাক্সিটিকে অস্পষ্ট দেখার কারণ হচ্ছে এটি অন্যদের চেয়ে কম আলোকিত? অথবা গ্যালাক্সিটি ছোটো তাই অনুজ্জ্বল দেখাচ্ছে, শুধু গায়ে-গতরে বড়ো হওয়ার কারণে তার থেকে অনেক দূরের গ্যালাক্সিগুলোকে তার তুলনায় বেশ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে!

এইজন্য হাবলকে বিভিন্ন ধরনের গ্যালাক্সি নিয়ে প্রচুর গবেষণা করতে হয়েছিল, এবং এমন সব গ্যালাক্সি বেছে নিতে হয়েছিল যেগুলো আমাদের থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে অবস্থিত, যেগুলো মোটামুটি একই পরিমাণ আলো বিকিরণ করে, অর্থাৎ যেগুলোর একটি নির্দিষ্ট উজ্জ্বলতা রয়েছে।

এরকম গ্যালাক্সিগুলোকে ‘standard candles’ বলা হয় (বাংলায় বাতিঘর বলা যায়?), কারণ যে কেউ তাদের অস্পষ্টতা থেকে তাদের দূরত্ব অনুমান করে নিতে পারে। ‘standard candles’ গ্যালাক্সি খুঁজে পাওয়া প্রচুর বিড়ম্বনার কাজ, যা এখনও নিখুঁতভাবে সমাধান করা যায়নি।

যাইহোক, হাবল দূরবর্তী গ্যালাক্সির ক্ষেত্রে যেটা খুঁজে পেয়েছিলেন তা হলো লাল সরণ এবং আপাত উজ্জ্বলতার মাঝে একটা সম্পর্ক। এই পদ্ধতিতে যে কেউ গ্যালাক্সির গতি এবং দূরত্বের মাঝে একটি সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে পারে। যা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দূর থেকেই বোঝা সম্ভব।

ছবি : Standard candles গ্যালাক্সি দ্বারা অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুর দূরত্ব নির্ণয় করা হয়




উৎসের স্থানচ্যুতি ছাড়াও আরও বহু কারণে লাল সরণ ঘটতে পারে, উদাহরণস্বরূপ, আলো যদি কোনো অতিকায় ভারী বস্তুর পাশ দিয়ে আসে (যেমন কোনো নক্ষত্র) এবং পর্যবেক্ষক তুলনামূলক কম ভারী বস্তুর পাশে থেকে আলোটাকে পর্যবেক্ষণ করেন (যেমন পৃথিবী) তাহলেও পর্যবেক্ষক আলোর লাল সরণ দেখতে পাবেন। একে বলে (Gravitational lensing) গ্রাাাভিটেশনাল লেন্সিং।

দূরবর্তী গ্যালাক্সিদের লাল সরণ কোনো গ্র‍্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের প্রভাবে ঘটছে না।

কারণ, প্রথমত এই লাল সরণগুলি এরকম গ্র‍্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের (যেমন কোনো নক্ষত্রের) চাইতেও বিশাল বিস্তৃত হয়। দ্বিতীয়ত, গ্র‍্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের প্রভাব ধরে নিলে লাল সরণ ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ার পূর্বানুমানের সাথে পর্যবেক্ষণ করা তথ্যে গড়মিল আসে।

সুতরাং বিশেষজ্ঞদের মতামত হলো : লাল সরণ গ্যালাক্সির স্থানচ্যুতির কারণেই ঘটছে, তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে মহাকর্ষ বা পদার্থবিদ্যার অন্য কোনো প্রক্রিয়ার সাহায্যে লাল সরণের বিকল্প ব্যাখ্যাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।


ছবি : গ্র‍্যাভিটেশনাল লেন্সিংয়ের কারণে আলো বেঁকে যাওয়ায় একই কোয়াসারকে চারটি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় দেখা যাচ্ছে




হাবলের আইন গ্যালাক্সির গতিবেগে কোনো লিমিট বসায় না, কারণ এই আইন অনুযায়ী একটি গ্যালাক্সির দূরত্ব অসীম হতে পারে। তো এটি কি আইনস্টাইন সাহেবের স্পেশাল রিলেটিভিটিকে বুড়ো আঙুল দেখায়?

জ্যোতির্বিদরা লাল সরণের দৈর্ঘ্য বোঝাতে ইংরেজি z অক্ষরটি ব্যবহার করেন। z হচ্ছে তরঙ্গদৈর্ঘ্য সরণের ভগ্নাংশ, অর্থাৎ প্রাপ্ত তরঙ্গদৈর্ঘ্য ও মূল তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মধ্যেকার পার্থক্য। প্রাপ্ত তরঙ্গদৈর্ঘ্যকে মূল তরঙ্গদৈর্ঘ্য দ্বারা ভাগ দিলে z পাওয়া যায়। আলোর গতি ধ্রুব, তার তুলনায় গ্যালাক্সির বেগ অনেক কম, গ্যালাক্সির গতিবেগ হচ্ছে তার লাল সরণ অর্থাৎ z, এই z কে আলোর গতি c দিয়ে গুণ দিলে গ্যালাক্সির গতিবেগ cz পাওয়া যাবে।

সুতরাং একটি গ্যালাক্সির লাল সরণ ০.১৫ হলে গতিবেগ হবে আলোর গতিবেগের ১৫% অর্থাৎ সেকেন্ডে ৪৫ হাজার কিলোমিটার। গ্যালাক্সির দূরত্ব যদি আলোর বেগের তিন ভাগের এক ভাগ হারেও বাড়ে তাহলেও লাল সরণ ওই গতিবেগকে ক্রস করে আমাদের নিকট আসতে পারবে না। যদিও অনেক দীর্ঘ লাল সরণ পর্যবেক্ষণ করা যায়, কিন্তু পর্যবেক্ষণের গতিও তো ওই আলোর গতিবেগ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। আমরা আলোর বেগের চাইতে দ্রুত তো আর পর্যবেক্ষণ করতে পারব না।

প্রকৃতপক্ষে লাল সরণ যত অসীম হবে, গ্যালাক্সির বেগ ততই আলোর বেগের কাছাকাছি পৌঁছাবে। আলোর বেগ ও লাল সরণের মধ্যেকার সম্পর্কটি গ্রাফ এঁকে এভাবে দেখানো যায় :

ছবি: একটি গ্রাফ



যে পরিমাণ দূরত্বে গ্যালাক্সির লাল সরণ অসীম হয়ে যায় তাকে সাধারণত দিগন্ত (Horizon) বলা হয়।

দিগন্তের ওপাশের গ্যালাক্সিগুলোকে পর্যবেক্ষণ করা যায় না। এর মানে কি এই নয় যে দিগন্তের ওপাশের গ্যালাক্সিগুলো আলোর চাইতে দ্রুতবেগে আমাদের থেকে সরে যাচ্ছে? হ্যাঁ ক্ষেত্রবিশেষে সেটা ঘটছে, কিন্তু সেটা বিভিন্ন কারণে স্পেশাল থিয়োরি অভ রিলেটিভিটির স্বীকার্য “কোনো বস্তুকণাই আলোর বেগের চেয়ে দ্রুততর হতে পারে না” এর সাথে সাংঘর্ষিক না। যেমন একটি কারণ হলো : স্পেশাল থিয়োরি অভ রিলেটিভিটিতে “মহাকর্ষ” বলতে কিছু নেই। যদিও মহাবিশ্বের সর্বত্র মহাকর্ষের টান কাজ করে, কিন্তু আলবার্ট আইনস্টাইনই (১৮৭৯-১৯৫৫) জেনারেল থিয়োরি অভ রিলেটিভিটি দ্বারা স্থান-কালের নতুন সংজ্ঞায়ন করে দেখিয়েছেন–মহাকর্ষ হচ্ছে জাস্ট স্পেইস-টাইমের “বক্রতা”র ফল। আর স্পেইস কোনো বস্তুকণা নয়, স্পেইসে ভেতর দিয়ে কোনো বস্তুকণা আলোর চেয়ে দ্রুতবেগে যেতে পারে না, কিন্তু স্পেইস ক্ষেত্রবিশেষে নিজে যে কোনো গতিতে সম্প্রসারিত হতে পারে। এই কারণেই আমাদের দৃষ্টিসীমার যে পয়েন্ট থেকে স্পেইস আলোর গতির চাইতে দ্রুত সরছে সেই পয়েন্টের ওপাশের অর্থাৎ হরাইজনের ওপাশের গ্যালাক্সিগুলোকে পর্যবেক্ষণ করা যায় না, যদিও আমরা সেগুলোর অস্তিত্ব অনুমান করতে পারি। মাধ্যাকর্ষণ সৃষ্টি হয় স্পেইসের “বক্রতা”র কারণে, যা একটি “বাঁকানো” স্পেইসের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে অবস্থিত দুজন পর্যবেক্ষকের মধ্যকার বেগের প্রচলিত ধারণাকে বদলে দেয়।

দূরবর্তী গ্যালাক্সিদের গতিবেগ বের করার সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে লাল সরণ। সুতরাং আমরা বলতে পারি, লাল সরণ দিগন্তে গিয়ে অসীম হয়ে যায়, যা দিগন্তের ওপাশের গ্যালাক্সিগুলোর বর্তমান অবস্থানকে আমাদের কাছে অ-পর্যবেক্ষণযোগ্য করে তুলে।


প্রতীকী ছবি : ভারী বস্তুর চারপাশে স্পেইস-টাইম কুঁচকে আছে




*বক্রতা অর্থে প্রচলিত বাঁকানো নয়, চতুর্মাত্রিক স্পেইস-টাইম আমাদের পরিচিত বস্তুর মতো বাঁকে না।


(প্রখ্যাত বাংলাদেশী জ্যোতির্বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলামের জনপ্রিয় বই The ultimate fate of the universe অবলম্বনে)

1 thought on “মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি–৭, গ্র‍্যাভিটেশনাল লেন্সিং ও স্পেইস-টাইমের সম্প্রসারণ”

  1. Pingback: মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি–৮, নিউটনের অনুমিত মহাবিশ্ব এবং অলবার্সের প্যারাডক্স - অক্ষর

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *