মহাবি

মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি–৫, মহাবিশ্বের প্রসারণ

পূর্ববর্তী লেখা না পড়ে থাকলে পড়ে আসুন এখান থেকে- মহাবিশ্বের অন্তিম পরিনতি-৪, অ্যান্ড্রোমিডা, গ্যালাক্সিপাড়ার বড়দি

মার্কিন জ্যোতির্বিদ এম. এল. হিউমাসন, তিনি ডপলার ইফেক্ট ব্যবহার করে অনেকগুলো মহাজাগতিক বস্তু পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।

পরে বিজ্ঞানী এডউইন হাবল জোরালোভাবে প্রমাণ করেন, এই আবছা বস্তুগুলোর বেশিরভাগই একেকটা আস্ত গ্যালাক্সি।

এরকম একেকটা গ্যালাক্সির মাঝে বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্রের বাস।

গ্যালাক্সিগুলো আমাদের থেকে খুব দূরে অবস্থান করছে, তাই আমরা এগুলোকে আবছা দেখি।


কথা হলো, এত গ্যালাক্সি কী করছে মহাবিশ্বে? এর শেষ কোথায়?

বিজ্ঞানীরা ভেবে কূল পেলেন না। বসানো হলো শক্তিশালী অপটিক্যাল আর রেডিয়ো টেলিস্কোপ। বিজ্ঞানীরা নিরন্তর টেলিস্কোপে চোখ রেখে আর ডাটা বিশ্লেষণ করে খুঁজে ফিরলেন মহাবিশ্বের সীমানা! ফলাফল?

যেদিকে দুচোখ যায় অথই গ্যালাক্সি আর গ্যালাক্সি। যতদূর চোখ পড়ল, গ্যালাক্সি বৈ অন্য কিছু দেখা যায় না। বোঝা গেল ; সমস্ত মহাবিশ্বটাই আসলে গ্যালাক্সিতে পরিপূর্ণ।

এরা কিন্তু একসাথে এঁটে নেই। একটা আরেকটার থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে। অনেকটা দ্বীপপুঞ্জের মতো ছড়িয়ে আছে।


মহাবিশ্ব মহাবিশ্ব করছি, মহাবিশ্বের সংজ্ঞা আসলে কী? সামনে এগুনোর আগে এইটা নিয়ে একটু কনফিউজড করি :


শক্তিশালী টেলিস্কোপে বহুদূর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করেও বিজ্ঞানীরা গ্যালাক্সি বৈ কিছু পাননি। তাহলে এটা অনুমান করা অযৌক্তিক না যে বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণকৃত শেষ সীমার পরেও রয়েছে এরকম গ্যালাক্সির পাড়া, বাকি সব গ্যালাক্সির মতোই এগুলোও একে অন্যের থেকে হাবলের নীতি অনুযায়ী দূরে সরছে।

তার মানে দাঁড়াচ্ছে, মহাবিশ্বকে সংজ্ঞায়িত করার একটি উপায় হলো একে গ্যালাক্সির সমষ্টি হিসেবে বিবেচনা করা।


তর্কের খাতিরে ধরে নিই, সবচেয়ে দূরবর্তী কোনো গ্যালাক্সিতে বুদ্ধিমান প্রাণীরা আছে। তাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে তারাও আমাদের মতোই তাদের চারপাশে অফুরন্ত গ্যালাক্সির বিন্যাস দেখতে পাবে। তারা তাদের পয়েন্ট অভ ভিউ থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী গ্যালাক্সিগুলোকে আমাদের মতোই পর্যবেক্ষণ করবে। দেখবে গ্যালাক্সিগুলো তাদের সাপেক্ষেও সমভাবে বিন্যস্ত।

এই যে পুরো মহাবিশ্ব জুড়েই সমবণ্টিত অগণিত গ্যালাক্সি, এটাকেই মহাবিশ্বের সমষ্টি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে।


এখানে একটি প্রশ্ন না এসেই পারে না, এমন কি কোনো গ্যালাক্সি আছে যা এই সমভাবে বিন্যস্ত নিয়মের আওতায় নেই? সহজ কথায়, আমরা যে গ্যালাক্সিসমৃদ্ধ মহাবিশ্ব দেখছি, হতে পারে না এরও একটা শেষ সীমা আছে? সেখান থেকে হয়তো শুরু হয়েছে মহাবিশ্বের অন্য কোনোরকম স্ট্রাকচার! অন্য কোনো প্যাটার্ন, যা আমরা কোনোদিন দেখিনি! হ্যাঁ, হতে তো পারে অনেক কিছুই। তবে এই প্রশ্নটি মহাবিশ্বের আরেকটি সংজ্ঞা everything that exists (যা যা থাকার সবই আছে) এর সাথে সম্পর্কিত।

আমরা ওপরে মহাবিশ্বের যে সংজ্ঞা দিয়েছিলাম, তার সাথে এই সংজ্ঞার কোনো মিল নেই। বলা যায় না, এই সংজ্ঞাও সত্যি হয়ে যেতে পারে! কিন্তু যাহোক, আজ আমরা প্রথম সংজ্ঞাটিই ব্যবহার করব, কারণ দ্বিতীয় সংজ্ঞা অনেক সম্পূরক প্রশ্নের জন্ম দেয়। (উদাহরণস্বরূপ : এই মহাবিশ্বের পরে আরও মহাবিশ্ব কি থাকা সম্ভব?) আর এগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে বর্তমানে কল্পনার আশ্রয় নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।


তো, অনেকগুলো গ্যালাক্সি নিয়ে গঠিত হয় একেকটি গ্যালাক্সি গ্রুপ, যাদেরকে গ্যালাক্সি ক্লাস্টার বলে।

একটি গ্যালাক্সি ক্লাস্টারে কয়েক হাজার গ্যালাক্সি থাকতে পারে।

তারপর অনেকগুলো গ্যালাক্সি ক্লাস্টার মিলে হয় একেকটি সুপারক্লাস্টার।

সুপারক্লাস্টার থাকার স্বপক্ষে কিছু ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, কিন্তু সুপারক্লাস্টারের সুপারক্লাস্টার বা এরচাইতে বড়ো কোনো শ্রেণিবিন্যাস থাকার পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই।

পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায় অতীতে গ্যালাক্সিগুলো পুরো মহাবিশ্বে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। তাই কোনো নির্দিষ্ট সময়ে আমরা যদি মহাবিশ্বের একটি অঞ্চলের সাথে একই সময়ে একই পরিসরে অন্য অঞ্চলের তুলনা করি, তখন দেখতে পাবো সব অঞ্চলেই গ্যালাক্সিগুলো সমভাবে বিন্যাস্ত।


যেমন, আমাদের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী গ্যালাক্সিটি প্রায় ১ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে রয়েছে। এভাবে গড় দূরত্ব ধরে যদি ১ মিলিয়ন আলোকবর্ষ পরপর প্রতিটি গ্যালাক্সি কল্পনা করি, আর মহাবিশ্বের যে কোনো অংশে ১০০ মিলিয়ন আলোকবর্ষের একটি কিউব কল্পনা করি তাহলে দেখতে পাবো এর ভেতর মোটামুটি ১০ হাজার গ্যালাক্সি রয়েছে। তবে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে পর্যবেক্ষণকালের সূচনা ও ব্যাপ্তি একই সময়ে হতে হবে। কারণ আমরা জানি গ্যালাক্সিগুলো গতিশীল অবস্থায় আছে, তাই ভিন্ন ভিন্ন সময়ে মহাবিশ্বের ভিন্ন ভিন্ন অংশ পর্যবেক্ষণ করলে সমবিন্যাস না-ও পাওয়া যেতে পারে।


এছাড়াও, বর্তমানে আমরা যে গ্যালাক্সিগুলো দেখছি সেগুলোর থেকে নিঃসৃত আলোককণা কোটি কোটি আলোকবর্ষ পাড়ি দিয়ে তারপর আমাদের চোখে এসে পৌঁছুচ্ছে, তাই আমরা আসলে দেখতে পাচ্ছি গ্যালাক্সিগুলোর কোটি কোটি সাল আগের প্রাচীন রূপ। গ্যালাক্সিটি যত দূরে অবস্থিত আমরা সেটির তত অতীত অবয়ব দেখতে পাচ্ছি। অর্থাৎ এদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আমরা সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। আর, এই দেখারও একটা লিমিট আছে।

১৩.৬ বিলিয়ন সাল আগে যখন বিগ ব্যাং সংঘটিত হয়, সেই থেকে কয়েক লক্ষ সাল ধরে পুরো মহাবিশ্ব প্লাজমা পদার্থ দ্বারা আচ্ছন্ন ছিল। তারপর যখন ধীরে ধীরে মহাবিশ্ব স্বচ্ছ হতে শুরু করে তখন ফোটনগুলো মুক্তভাবে ছোটার পথ খুঁজে পায়। সেই ফোটনগুলোই বিগ ব্যাং এর ফসিল, বিগ ব্যাং এর পরোক্ষ প্রমাণ। বিজ্ঞানীরা যার নাম দিয়েছেন “কসমিক মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশন”।


এখনও মহাবিশ্বের একটা নির্দিষ্ট দৃষ্টিসীমায় আমাদের চোখ আটকে যায়। বিগ ব্যাং এর পরের কয়েক লক্ষ বছরের সেই প্লাজমা আবরণ ফুঁড়ে আমরা কিছু দেখতে পারি না। আর হ্যাঁ, মহাবিশ্বের সেই দৃষ্টিসীমা এখনো ১৩.৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরত্বে বসে নেই। স্পেইসের প্রতিনিয়ত সম্প্রসারণের ফলে এর বর্তমান অবস্থান গিয়ে ঠেকেছে ৪৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে।

আর এই যে আমাদের পয়েন্ট অভ ভিউ থেকে আমরা চারিপাশে ৪৬ বিলিয়ন দূর পর্যন্ত দেখতে পারছি এই গোলকটাই হচ্ছে আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্ব, একেই বলে হাবল স্ফিয়ার।

এর পরের স্পেইস আলোর চাইতে দ্রুতবেগে আমাদের দৃষ্টিসীমার শেষ থেকে দূরে সরে গেছে, তাই সেখান থেকে কোনো তথ্য আমরা কখনোই জানতে পারব না।


বলছিলাম গ্যালাক্সিগুলোর বিন্যাসের কথা। গ্যালাক্সিগুলোর বিন্যাসও আমাদের সাপেক্ষে সম্পূর্ণ আইসোট্রপিক। (আইসোট্রপিক হচ্ছে এমন একটা অবয়ব যাকে যেকোনো দিক থেকে মাপলে একই মান আসে) অর্থাৎ গ্যালাক্সিগুলো আমাদের চারদিক থেকে সমভাবে বিন্যস্ত। এখন এই ধারণার ভিত্তিতে যদি ধরে নিই আমাদের অবস্থান মহাবিশ্বের কোনো বিশেষ স্থানে বা কেন্দ্রে নয়, তাহলে আমরা একটা উপসংহারে পৌঁছুতে পারি যে–গ্যালাক্সিগুলোর বিন্যাস যে কোনো সময়ে যেকোনো গ্যালাক্সির সাপেক্ষে আইসোট্রপিক।

এবং সত্যিই যদি এমনটা হয়ে থাকে, তাহলে আমরা নিশ্চিতভাবে ধরে নিতে পারি গ্যালাক্সিগুলো মহাবিশ্বে সমসত্ত্বভাবে ছড়িয়ে রয়েছে।


বিজ্ঞানী এডউইন হাবল ১৯৩০ সালে পর্যবেক্ষণ করে দেখেছিলেন গ্যালাক্সিগুলো একে অন্যের সাপেক্ষে দূরে সরছে, তিনি আরও দেখতে পেয়েছিলেন গ্যালাক্সিগুলোর অবস্থানের সাথে দূরে সরার হার বিশেষভাবে সম্পর্কিত, অর্থাৎ, একটা গ্যালাক্সি আরেকটা গ্যালাক্সি থেকে যত দূরে অবস্থিত সে তার সাপেক্ষে তত দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছে। গ্যালাক্সির এই দূরে সরার হারটি হাবলের নীতি অনুসরণ করে। এই নীতি অনুযায়ী গ্যালাক্সির দূরত্বকে হাবলের বিশেষ ধ্রুবকের সাথে গুণ করলে গ্যালাক্সিটি কত বেগে দূরে সরছে সেই হিসেব পাওয়া যায়। অন্যভাবে আমরা বলতে পারি গ্যালাক্সির এই বেগটি তার দূরত্বের সমানুপাতিক।

মনে করি একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর কয়েকটা গ্যালাক্সি আছে, এখন প্রথম এবং দ্বিতীয় গ্যালাক্সির মধ্যেকার দূরত্ব যে হারে বাড়বে সেই তুলনায় প্রথম এবং তৃতীয় গ্যালাক্সির দূরত্ব দ্বিগুণ হারে বাড়বে। তবে খুব কাছের দুটো গ্যালাক্সির মধ্যে এই নিয়ম কার্যকর থাকে না। কারণ গ্যালাক্সি দুটোর মধ্যেকার স্পেইস সম্প্রসারণের গতি ছাড়াও প্রতিটি গ্যালাক্সির নিজস্ব গতি রয়েছে।

যেমন আমাদের “হোম” গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ের সাথে আমাদের পড়শী গ্যালাক্সি অ্যান্ড্রোমিডার দূরত্ব দিনদিন কমছে, কারণ গ্যালাক্সি দুটো যথেষ্ট কাছে হওয়ায় একে অন্যের মহাকর্ষের টান উপেক্ষা করতে পারছে না।


অতি দূরবর্তী দুটো গ্যালাক্সির মধ্যেকার সম্প্রসারণের হার মাপার ক্ষেত্রেও হাবলের নীতি অসীম মান দেয়। এদিকে আইনস্টাইনের স্পেশাল থিয়োরি অভ রিলেটিভিটি অনুযায়ী কোনোকিছুই আলোর চেয়ে দ্রুততর হতে পারে না। এখন এই দুটো বিষয় কি সাংঘর্ষিক হয়ে গেল? না, স্পেইসের ভেতর আলোর চেয়ে বেশি গতিতে কেউই ছুটতে পারে না। কিন্তু স্পেইস নিজে যেকোনো গতিতে ফাঁপতে পারে। এতে আইনস্টাইন সাহেবের কোনো মাথাব্যাথা নেই। সেটা আমরা বিস্তারিত জানব, তবে এখন না, পরবর্তীতে যখন রেড শিফটের ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করব তখন এই বিষয়টা মাথায় রাখলেই হবে।



(প্রখ্যাত বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলামের The ultimate fate of the Universe অবলম্বনে)

পরবর্তী লেখাটি পড়তে পারেন এখান থেকে- মহাবিশ্বের অন্তিম পরিনতি-৬, রেড শিফট ও তরঙ্গ কথন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *