মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ

মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি (১১শ পর্ব)
মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি (১১শ পর্ব)
  1. মহাবিশ্ব, এই যাত্রার শেষ কোথায়?
  2. মহাবিশ্ব মাপার ফিতে
  3. মিল্কিওয়ে: আমাদের নক্ষত্রবাড়ি
  4. অন্যান্য গ্যালাক্সিরা
  5. মহাবিশ্বের মহাবিন্যাস
  6. মহাবিশ্বের মহাপ্রসারণ এবং তরঙ্গ কথন
  7. রেড শিফট এবং ডপলার ইফেক্ট
  8. অলবার্সের প্যারাডক্স
  9. মহাবিশ্বের নানা মডেল
  10. মহাবিশ্বের গাণিতিক প্রকৃতি
  11. মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ
  12. আদি কণাদের প্রাথমিক পরিচিতি

মহাবিশ্ব এখনো সম্প্রসারিত হচ্ছে, অর্থাৎ, প্রাথমিক বিস্ফোরণের কারণে গ্যালাক্সি ক্লাস্টারগুলো একে অন্যের থেকে এখনো দূরে সরে যাচ্ছে, এই দূরে সরে যাওয়ার পেছনে কিন্তু গ্যালাক্সি ক্লাস্টারদের নিজস্ব কোনো চালিকাশক্তি নেই। প্রাথমিক বিস্ফোরণ থেকেই গ্যালাক্সি ক্লাস্টারগুলি এই গতিশক্তি প্রাপ্ত হয়ে সচল হয়েছে। কিন্তু মহাকর্ষীয় বলের পিছুটানে গ্যালাক্সি ক্লাস্টারদের এই গতিবেগটি দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।

বিগ ব্যাং ঘটার কি কোনো সরাসরি প্রমাণ আছে? গ্যালাক্সি ক্লাস্টারগুলোর দূরে সরা বাদেও আরেকটি অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে, এই প্রমাণটিকে বলা হয় “মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ”। বিষয়টা ব্যাখ্যা করা যাক:

আমরা মহাবিশ্বের যতই অতীতে যাবো, ততই দেখব মহাবিশ্বটা ক্রমশ ঘন হয়ে উঠছে, এভাবে যেতে যেতে আমরা অতীতের এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাবো যখন গ্যালাক্সিগুলো পরষ্পর এঁটে আছে, সব পদার্থ তখন একসাথে ঠাসা অবস্থায়, পুরো মহাবিশ্বের অকল্পনীয় ভরটা তখন একসাথে কুঁচকে আছে। এই অবস্থায় কী ঘটবে? আমরা জানি পদার্থ সংকুচিত হলে এর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়, তাহলে সেই চরম সংকুচিত অবস্থায় এর তাপমাত্রাও অকল্পনীয় বেশি হবে এটাই তো স্বাভাবিক।

মহাবিশ্বের সূচনালগ্নে পদার্থগুলো খুব ঘন ও উচ্চ তাপমাত্রায় কুঁচকে ছিল। ছবির ক্রেডিট: Gnixon

এরকম মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে, আমরা পরবর্তীতে দেখব সেই সময় পদার্থের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুচ্চৌম্বকীয় বিকিরণ ছিল, যেমন বেতার তরঙ্গ, ইনফ্রারেড এবং দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গ ইত্যাদি। কোনো এক পর্যায়ে এই বিকিরণগুলো পদার্থের সাথে সাম্যাবস্থায় অবস্থান করছিল। আর যখন বিকিরণগুলি পদার্থের সাথে সাম্যাবস্থায় থাকে, অর্থাৎ পদার্থ যখন প্রতিটি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিকিরণকে (তরঙ্গদৈর্ঘ্য বনাম শক্তি ঘনত্বের গ্রাফকে) সমানভাবে শোষণ ও নির্গত করে তখন বিকিরণের বর্ণালীর একটি নির্দিষ্ট ফর্ম তৈরি হয়, যা শুধুমাত্র পদার্থের তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে, পদার্থের প্রকৃতি বা বিকিরণের সাথে এর সাম্যাবস্থার ওপর নির্ভর করে না। বর্ণালীটিকে সাধারণ তাপমাত্রায় অনেকটা নিচের গ্রাফের মতো দেখায় এবং বিকিরণটি কৃষ্ণবস্তু থেকে নির্গত বিকিরণের মতোই।

তরঙ্গদৈর্ঘ্য বনাম তীব্রতার গ্রাফ

কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণের বর্ণালী খুঁজে পাওয়ার সমস্যাটি ঐতিহাসিকভাবে খুবই বিখ্যাত, বিশ শতকের শুরুর দিকে জার্মান পদার্থবিদ “ম্যাক্স কার্ল আর্নস্ট লুডভিগ প্ল্যাঙ্ক” এই সমস্যাটির সমাধান করেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন এই বিকিরণ নিরবিচ্ছিন্ন না হয়ে গুচ্ছ আকারে বের হয়, তিনি এই গুচ্ছের নাম দিয়েছিলেন ‘কোয়ান্টা’। পরবর্তীতে এই কোয়ান্টাই ফোটন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই কোয়ান্টা থেকেই জন্ম নিয়েছিল কোয়ান্টাম মেকানিক্স নামে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের আস্ত একটা শাখা! সামনে কোয়ান্টাম মেকানিক্স এবং ফোটন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। যাহোক, গুচ্ছাকারে প্ল্যাঙ্কের সূত্রটি ছিল এরকম:

কৃষ্ণবস্তু বিকিরণে পূর্ণ একটি বক্স, যাতে সব ধরনের তরঙ্গদৈর্ঘ্যগুলোর শক্তি বা বিকিরণের তীব্রতা ক্রমবর্ধমান তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সাথে পাল্লা দিয়ে তরতর করে বেড়ে চূড়ায় ওঠে, এবং আবার তরতর করে নামে। বর্তমান ধারণা অনুযায়ী, বিগ ব্যাং-এর প্রাক্কালে খুব উচ্চ চাপ ও তাপে ঘনীভূত পদার্থের পাশাপাশি যে প্রচণ্ড বিকিরণের সৃষ্টি হয়েছিল, তার অবশিষ্টাংশটি এখনও থাকার কথা। তবে এই বিকিরণের তাপমাত্রা এখন অনেক কম হতে হবে। কারণ মহাবিশ্ব ক্রমশ প্রসারিত হওয়ায় এই বিকিরণটাও শীতল হয়ে আসছে।

কৃষ্ণবস্তু এবং মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ

বিকিরণটি প্রায় কৃষ্ণবস্তর বিকিরণের মতোই, সুতরাং হিসাব নিকাশ বলছে–এটি বর্তমানে বিদ্যুচ্চৌম্বকীয় বিকিরণ আকারে একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সমগ্র মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকার কথা, এবং বিকিরণটি মহাবিশ্বের মতোই সমসত্ত্ব ও সুষম হওয়ার কথা। ১৯৬৫ সালে এ.এ পেনজিয়াস এবং আর ডব্লু উইলসন সত্যিসত্যিই এই সমসত্ত্ব বিকিরণটি খুঁজে পান। তারা এই বিকিরণটির তাপমাত্রা মেপেছিলেন ৩ কেলভিন। (কেলভিন হচ্ছে এমন একটি স্কেল যা পরম শূন্য থেকে তাপমাত্রার পরিমাপ করে, মাইনাস ২৭৩° সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রাকে পরম শূন্য তাপমাত্রা ধরা হয়)। পেনজিয়াস এবং উইলসন বিকিরণটির তরঙ্গদৈর্ঘ্য মেপেছিলেন ৭.৩৫ সে.মি। তাঁদের এই আবিষ্কারের পর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্য নিয়ে কাজ করা বহু পর্যবেক্ষকগণ এটার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। এখন পর্যন্ত পাওয়া সমসত্ত্ব মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণের (এখানে ‘পটভূমি’ মানে বাইরের কিছু না, পুরো মহাবিশ্ব এই বিকিরণে আচ্ছন্ন হয়ে আছে তাই এমন নামকরণ) বর্ণালীটি কৃষ্ণবস্তুর বিকিরণের ধরণের সাথে প্রত্যাশিতভাবেই মিলে গেছে। কেউ কেউ অবশ্য এই বিকিরণটির উৎস হিসেবে মহাবিশ্বের সূচনালগ্নকে মানতে নারাজ, তারা ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন বিকিরণটি মহাবিশ্বের গ্যালাক্সিগুলো থেকে নির্গত কোনো বিকিরণ হতে পারে, কিন্তু এরকম ব্যাখ্যা হালে পানি পায়নি।

ধারণা করা হয় মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণের মধ্যে প্রতিনিয়ত একটি সূক্ষ্ম বৈচিত্র্য বিদ্যমান। এর কারণ হচ্ছে পৃথিবী এই বিকিরণের স্রোতের মধ্যে ভ্রমণ করার সময় পৃথিবীর যেদিকটা বিকিরণের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হচ্ছে সেদিকটা খুবই সামান্য পরিমাণে হলেও উষ্ণ হওয়া উচিৎ, এবং বিপরীত দিকটা সে তুলনায় একটু হলেও শীতল থাকা উচিৎ। ১৯৭৭ সালে আর.এ মুলার এবং তাঁর সহযোগীরা এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটিও আবিষ্কার করে ফেলেন! তারা দেখতে পেলেন এই তাপমাত্রাটি সিংহ নক্ষত্রমণ্ডলের দিকে সামান্য বেশি (১ ডিগ্রির ৩০০ ভাগের ১ ভাগ) এবং বিপরীত দিকে একই পরিমাণ কম। এই পার্থক্যটি মহাবিশ্বের নিরিখে পৃথিবীর পরম গতিকে নির্দেশ করে, পৃথিবীটা প্রায় ৪০০ কিলোমিটার/সেকেন্ড গতিতে সিংহ নক্ষত্রমণ্ডলের দিকে দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছে। আসলে পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে আর সূর্য মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করছে, এই সব গতিকে হিসেব নিকেশ করে উপসংহারে আসা যায় যে, আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিটি সেকেন্ডে ৬০০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলেছে। এই দানবীয় গতি নিঃসন্দেহে অভাবনীয়, কিন্তু অযৌক্তিক নয়। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিটি তার লোকাল গ্যালাক্সি ক্লাস্টারকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, এই গতিটা তার একটা বেশ ভালো উদাহরণ।

মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণের সূক্ষ্ম অসামঞ্জস্যতা (অ্যানাইসোট্রপি)

কসমোলজির এ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটো পর্যবেক্ষণের একটি হচ্ছে এই মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণ, অন্যটি হচ্ছে হাবলের সেই বিখ্যাত পর্যবেক্ষণ, গ্যালাক্সি ক্লাস্টারগুলোর পরষ্পর দূরে সরে যাওয়া। মহাজাগতিক পটভূমি বিকিরণের অস্তিত্ব জোরালোভাবে ইঙ্গিত দেয় যে প্রাথমিক মহাবিশ্বটি অত্যন্ত চাপ ও উচ্চ তাপমাত্রায় চুপসে ছিল, সেখানে পদার্থ এবং বিকিরণের একটা সাম্যাবস্থা বিরাজ করেছিল। এই বিকিরণটি মহাবিশ্বের উৎপত্তি হিসেবে ‘বিগ ব্যাং’ কে সমর্থন করে, তবে “মহাবিশ্বের উৎপত্তি নিয়ে সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে”–এমনটা ভাবলে বেআক্কেলী হবে। আসলে বিগ ব্যাং-এর সঠিক প্রকৃতি সম্পর্কে এখনো অনেক কিছু বোঝার বাকি রয়ে গেছে। বিশেষ করে, বিগ ব্যাং-এর আগে মহাবিশ্বের অন্য কোনো পর্যায় ছিল কি না, নাকি বিগ ব্যাং ঘটার মুহূর্ত থেকেই সময়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল? এগুলো হচ্ছে বর্তমান বিজ্ঞানের জটিলতর প্রশ্ন, যার এখন পর্যন্ত কোনো সন্তোষজনক উত্তর নেই।