লবণ : ভালো না খারাপ?

স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন যাবত আমাদের লবণ এর অপকারীতা সম্পর্কে সতর্ক করে আসছে।

এর কারণ হল উচ্চমাত্রায় লবণ গ্রহণের কারণে উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগ সহ বেশ কয়েকটি স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।

যাইহোক, দশক ধরে চলা গবেষণা এটা সমর্থন করার জন্য শক্ত প্রমাণ সরবরাহ করতে সক্ষম হয় নি()।

আবার, অনেক গবেষণায় দেখা যায় যে খুব কম লবণ খাওয়াও ক্ষতিকর হতে পারে।

লবণ কি?

এই আর্টিকেলে লবণ ও স্বাস্থ্যে এর প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার চেষ্টা করা হয়েছে।

সোডিয়াম ক্লোরাইডের(NaCl) সার্বজনীন নামই হচ্ছে লবণ। এর ওজনের ৪০% সোডিয়াম ও ৬০% ক্লোরাইড।

এখন পর্যন্ত লবণ সোডিয়ামের সবচেয়ে সাধারণ উৎস এবং “লবণ” এবং “সোডিয়াম” শব্দটি প্রায়শই পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, আয়রন এবং দস্তা লবণের কয়েকটি ভ্যারাইটি। খাবার লবণে আলাদাভাবে আয়োডিন যুক্ত করতে হয়(,)।

এর প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানগুলো শরীরের ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্য বজায় রাখে। এছাড়া শরীরে পানির ভারসাম্য, স্নায়ুতন্ত্রের উন্নয়ন এবং পেশীর কাজ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।

বেশিরভাগ খাবারে প্রাকৃতিকভাবে কিছু পরিমাণ লবণ পাওয়া যায়। খাবারের স্বাদ বাড়াতে প্রায়শই খাবারে অতিরিক্ত কিছু লবণ যুক্ত করা হয়।

ঐতিহাসিকভাবে, খাবার সংরক্ষণের জন্য এর ব্যবহার করা হত। অধিক পরিমাণ লবণ প্রয়োগে ব্যাকটিরিয়ার বৃদ্ধি রোধ করা যায় যা খাবার পচন থেকে রক্ষা করে।

দুটি উপায়ে লবণ উৎপাদন করা হয়। খনি এবং সমুদ্রের পানি ও অন্যান্য খনিজ সমৃদ্ধ পানি এর অন্যতম উৎস।

অনেক ধরনের লবণ আছে, সাধারণ কয়েক ধরনের লবণের মধ্যে প্লেইন টেবিল, হিমালিয়ান পিংক ও সামদ্রিক লবণ উল্লেখযোগ্য।

বিভিন্ন ধরণের লবণের স্বাদ, গঠন এবং রঙে ভিন্নতা থাকতে পারে।

মূলত

লবণ দুটি খনিজ, সোডিয়াম এবং ক্লোরাইডের সমন্বয়ে গঠিত যা বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজ করে থাকে। এটি বেশিরভাগ খাবারে প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায় এবং স্বাদ বাড়াতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

হার্টের স্বাস্থ্যে লবণের প্রভাব কি?

স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো কয়েক দশক ধরে আমাদের মানবদেহে সোডিয়ামের চাহিদার পরিমাণ নিয়ে তথ্য দিয়ে আসছে।
তারা বলছে আপনার ২৩০০ মি. গ্রা. এর বেশি সোডিয়াম গ্রহণ করা উচিত নয়, এর চেয়ে কিছুটা কম হলে সমস্যা নেই(৪,,)।

এই পরিমাণ সোডিয়াম ১ চা-চামচ বা ৬ গ্রাম লবণ থেকে পাওয়া যেতে পারে।

তবে ৯০% প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকান এর চেয়ে বেশি বেশি গ্রহণ করেন(৭)।

অতিরিক্ত লবণ রক্তচাপ বৃদ্ধি করে, এতে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

তবে কম সোডিয়াম গ্রহণের উপকারিতা সম্পর্কেও কিছু সন্দেহ এখনো রয়েছে।

এটা সত্য যে লবণ গ্রহণের মাত্রা কমালে রক্তচাপ কমে। বিশেষত যাদের সল্ট সেনসিটিভ হাইপারটেনশন (উচ্চ রক্তচাপ) রয়েছে(৮)।

তবে স্বাস্থ্যবান ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই পার্থক্য খুবই সুক্ষ্ম।

২০১৩ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে রক্তচাপ স্বাভাবিক এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে লবণ গ্রহণের মাত্রা কমিয়ে আনায় সিস্টোলিক রক্তচাপ ২.৪২ মি. মি. মার্কারি ও ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ ১ মি. মি. মার্কারি মাত্র হ্রাস পেয়েছিল(৯)।

অর্থাৎ ১৩০/৭৫ মি. মি. মার্কারি থেকে কমে ১২৮/৭৪ মি. মি. মার্কারিতে কমে যাওয়ার মতো। এটা তেমন কার্যকর কোনো ফলাফল না যার কারণে সাধের ভোজন বিস্বাদ করবেন।

এছাড়াও আরো কিছু গবেষণার প্রাপ্ত প্রমাণ থেকে দেখা যায় খাবারে এর মাত্রা কমালে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও স্ট্রোক কিংবা মৃত্যু এড়ানো সম্ভব নয়(১০,১১)।


লবণ গ্রহণের মাত্রা কমালে রক্তচাপ অতি অল্প পরিমাণে হ্রাস পায়। যাইহোক, এমন জোড়ালো প্রমাণ নেই যে লবণের মাত্রা কমালে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে।

মূলত

লবণ গ্রহণের মাত্রা কমালে রক্তচাপ অতি অল্প পরিমাণে হ্রাস পায়। যাইহোক, এমন জোড়ালো প্রমাণ নেই যে লবণের মাত্রা কমালে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে।

কম লবণ গ্রহণ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর

কিছু গবেষণার প্রমাণ রয়েছে যে কম লবণ গ্রহণ স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।

এখানে কম লবণ গ্রহণের কিছু অপকারীতা সম্পর্কে বর্ননা করা হল:
এল ডি এল (খারাপ) কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাই বেড়ে যায়:
লবণ গ্রহণের মাত্রা কমালে কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাই বেড়ে যায়(১২)।

হৃদরোগ: বেশ কিছু গবেষণার রিপোর্ট বলছে যে দৈনিক ৩০০০ মি. গ্রা. এর কম লবণ গ্রহণ হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়(১৩,১৪,১৫,১৬)।

হার্ট ফেইলিউর: আরো কিছু গবেষণা বলছে হার্ট ফেইলিউরের রোগীর ক্ষেত্রে কম লবণ খাওয়া মৃত্যু ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়(১৭)।

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স: আরো কিছু গবেষণার রিপোর্ট বলছে কম লবণ খাওয়ার ফলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স দেখা দিতে পারে(১৮,১৯,২০,২১)।

টাইপ ২ ডায়াবেটিস : আরো একটি গবেষণা বলছে কম লবণ খাওয়া টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীদের মৃত্যু ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়(২২)।

মূলত

কম লবণ খাওয়ার ফলে এল ডি এল (খারাপ কোলেস্টেরল, ট্রাইগ্লিসারাইড বৃদ্ধি ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স দেখা দিতে পারে। এছাড়াও হৃদরোগ হার্ট ফেইলিউর ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসে মৃত্যু ঝুঁকি বৃদ্ধি করে দিতে পারে।

উচ্চমাত্রায় লবণ গ্রহণ পাকস্থলীর ক্যান্সারের কারণ

পাকস্থলীর ক্যান্সার বা গ্যাস্ট্রিক ক্যানসার সবচেয়ে সাধারণ ক্যান্সারের মধ্য পঞ্চম।

বিশ্বে ক্যান্সারের মৃত্যুর ক্ষেত্রে তৃতীয় অবস্থানে আছে। প্রতিবছর ৭ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী(২৩)।

বেশ কয়েকটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় উচ্চ-লবণযুক্ত খাবারের সাথে পাকস্থলীর ক্যান্সারের সম্পর্ক পাওয়া যায়(২৪, ২৫, ২৬, ২৭)।

২০১২ সালের একটি বিশাল পর্যালোচনা নিবন্ধে মোট ২,৬৮,৭১৮জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ৭’টি গবেষণা চালানো হয়(২৮)।

এতে দেখা যায় যে যারা কম লবণ গ্রহণ করেন তাদের তুলনায় যারা বেশি গ্রহণ করেন তাদের মধ্যে পাকস্থলীর ক্যান্সারের ঝুঁকি ৬৮% বেশি থাকে।

ঠিক কীভাবে বা কেন এটি হয় তা ভালভাবে বোঝা যায় না, তবে এ সম্পর্কে বেশ কয়েকটি তত্ত্ব রয়েছে:

ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি : অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ হেলিকোবেক্টার পাইলোরি নামক ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধিতে সহায়ক যা পাকস্থলীর প্রদাহ ও এবং পাকস্থলীর আলসারের জন্য দায়ী। যা থেকে পাকস্থলীর ক্যান্সার সৃষ্টি হতে পারে(২৯,৩০,৩১)।
পাকস্থলীর বাইরের আবরণের ক্ষতি করে :
উচ্চ মাত্রায় লবণ গ্রহণ পাকস্থলীর আবরণ নষ্ট করে দিতে পারে, এতে তা কার্সিনোজেনে পরিণত হতে পারে(২৫,৩১)।

তবে এই গবেষণাগুলো পর্যবেক্ষণমূলক। এতে এটা প্রমাণ হয় না যে উচ্চমাত্রায় লবণ গ্রহণের ফলে পাকস্থলীর ক্যান্সার হবেই। মোটকথা এরা গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত।

মূলত

বেশ কয়েকটি পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় উচ্চমাত্রায় গ্রহণের সাথে পাকস্থলীর ক্যান্সারের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে এর পিছনে আরো বিভিন্ন নিয়ামক কাজ করতে পারে।

কোন খাবারগুলো উচ্চমাত্রায় লবণ বা সোডিয়াম যুক্ত?

আমাদের খাদ্যাভ্যাসের বেশিরভাগ উচ্চ লবণযুক্ত খাবারেরই উৎস রেস্তোরাঁ বা প্যাকেটজাত এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার।

মূলত এটি অনুমান করা হয় যে আমেরিকান ডায়েটের প্রায় ৭৫ শতাংশ লবণের উৎস প্রক্রিয়াজাত খাবার। মাত্র ২৫% বিভিন্ন খাদ্য থেকে আসে বা রান্নার সময় খাদ্যে যুক্ত করা হয়(৩২)।

সল্টেড স্ন্যাকস, ক্যানের খাদ্য, ইনস্ট্যান্ট স্যুপ, প্রক্রিয়াজাত মাংস, আচার এবং সয়া সস উচ্চ লবণযুক্ত খাবারের উদাহরণ।

আপাতদৃষ্টিতে লবণ মুক্ত মনে হয় এমন কিছু খাবার রয়েছে যাতে আশ্চর্যজনকভাবে উচ্চ মাত্রায় এর উপস্থিতি থাকে যার মধ্যে রুটি, পনির এবং কিছু নাস্তার শস্য।

মূলত

যে খাবারে লবণের পরিমাণ বেশি থাকে তাদের মধ্যে প্রক্রিয়াজাত খাবার যেমন স্ন্যাকস এবং ইনস্ট্যান্ট স্যুপ এবং যা আপাতত দৃষ্টিতে লবণ যুক্ত মনে হয় না যেমন রুটি এবং পনিরের মত খাবার প্রচুর পরিমাণে থাকতে পারে।

তাহলে কি লবণ কম খাবেন?

কিছু স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে খাবারে লবণ কমিয়ে আনতে হয়। যদি আপনার ডাক্তার আপনার খাবারে পরিমাণ কমাতে বলেন তবে অবশ্যই তা মেনে চলুন(৮,৩৩)।

তবে, আপনি যদি একজন সুস্থ ব্যক্তি হন তবে আপনার এ সম্পর্কে তেমন চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই।

এক্ষেত্রে, খাবারের স্বাদ বাড়ানোর জন্য রান্না করার সময় বা খাওয়ার পাতে অল্প লবণ খেতে কোনো সমস্যা নেই।

অত্যন্ত বেশি পরিমাণে খাওয়া যেমন ক্ষতিকর হতে পারে তেমন খুব কম খাওয়াও আপনার স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ হতে পারে(১৬)।

And that’s it.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *