বই লেখার কলাকৌশল

লেখালেখি প্রসঙ্গে মার্ক টোয়েন বলেন,

লেখালিখিটা তখনই সহজ, যখন ভুল শব্দগুলো উপেক্ষিত হয়।

লেখক হিসেবে অকপটে বলতে পারি–একজন লেখকের ক্ষেত্রে লিখতে বসাটা খুবই পরিশ্রমী একটা কাজ। লেখাটা অটোম্যাটিক্যালি আসে না, এজন্য সময় এবং শ্রম উজাড় করে দিতে হয়।

বই লিখার আগে অভিজ্ঞতা অর্জন করাটা জরুরি। আপনাকে সবার আগে একজন আদর্শ পাঠক হতে হবে। সাহিত্য সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে এবং ভাষার ওপর দখল থাকা লাগবে। আপনার অবসর সময়ের বড়ো একটা অংশ জুড়ে থাকবে বইপড়া।

জীবনের আড়ালে পড়ে থাকা কথাগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করুন। কঠিন বিষয়গুলো নিয়ে ভাবুন, সেগুলোকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে সহজভাবে পাঠকদের কাছে তুলে ধরুন। জীবন ও সমাজের এমন জটিল কোনো সমস্যার ওপর আলোকপাত করুন যেটা মানুষকে আগ্রহী করে তুলবে। অযথা কঠিন শব্দ ব্যবহার পরিহার করুন। নিজের পাণ্ডিত্য দেখাতে বাক্যকে জটিল করে তুলবেন না বা সহজ কথাকে ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে বলবেন না।

এইতো কয়েক বছর আগেও, আমি একজন প্রফেশনাল রাইটার হওয়ার স্বপ্ন পুষতাম। নিজের ভেতর উপলব্ধি করতাম–আমার কাছে বলার মতো এমন কিছু আছে, যা সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া উচিত। আজ যখন আমি সেই সময়টুকুতে ফিরে তাকাই তখন বুঝতে পারি আমার চাওয়া এবং চাওয়াটাকে বাস্তবে পরিণত করার ক্ষেত্রে কতটুকু আকাশ পাতাল ফাঁক ছিল!

সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, শুরুতেই আপনি “একেবারেই সব লিখে টুকে ফেলবো” ভেবে বসলে ভুল করবেন। লেখালিখিটা ঠিক এভাবে হয় না। মাথায় কনসেপ্ট এনে, পাণ্ডুলিপিতে শব্দের বুনন দিয়ে বাক্য গেঁথে, বাক্যের সম্ভার দিয়ে লেখাটাকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে হয়, এগুনোর প্রসেসটা হতে হয় ধাপে ধাপে, ধীরে ধীরে।

এভাবে চেষ্টা করলে লেখাটা সহজ হয়, কোনো প্রেশার আসে না । মাথায় যখন যা আসে সেটা হারিয়ে যাওয়ার আগেই লিখে ফেলুন, পরে কী লিখবেন সেটা পরে ভাবা যাবে। মোদ্দাকথা হলো, সবকিছু একসাথে মাথায় রাখলে গুলিয়ে যাবে।

কীভাবে একটা পাণ্ডুলিপি লেখার কাজ এগুতে হয় সেটার কিছু মৌলিক বিষয়ে আলোকপাত করার জন্যই আমার আজকের এই প্রচেষ্টা। কঠিন ব্যাপারগুলো যথাসম্ভব সহজভাবে বোঝানোর চেষ্টা করব যাতে সবাই সহজে বুঝতে পারে।

প্রথমেই, আপনি যদি একটি ভালো বই লিখতে ইচ্ছুক হোন এবং কীভাবে কোথা থেকে শুরু করবেন সে বিষয়ে কনফিউজড হয়ে থাকেন তাহলে এই পোস্ট আপনাকে হেল্প করবে।

একটি ভালোমানের বই লিখতে হলে তিনটি ধাপ আপনাকে খুব সতর্কভাবে পেরোতে হবে। এই ধাপগুলোতে আবার মোট দশটি টিপস ও দেওয়া আছে। এবার তাহলে ধাপগুলো নিয়ে আলোচনায় যাই–

সূচনা : কী লিখবেন, কীভাবে লিখবেন, আর কোথা থেকে শুরু করবেন–এই বিষয়গুলো আগে মাথার ভেতর ভালো করে সাজিয়ে নিন। এই বিষয়গুলোর প্রতি একটুও অমনোযোগী হওয়া মানে কুঁড়িকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে ফেলা। অতএব গুছিয়ে শুরু করুন।

সাধনা : বেশিরভাগ লোকই কিছুদূর লিখে ঝিমিয়ে পড়ে, ফলে তাদের আর ‘লেখক’ হওয়া হয়ে ওঠে না। এখান থেকেই আসলে সাধনার শুরু, লেখা ফেলে না রেখে নিয়মিত লেখার অভ্যাস করুন, জানুন, ভাবুন, বিশ্লেষণ করুন, তারপর লিখুন, লেখা মনমতো না হলে কেটে আবার লিখুন, কোথায় বাধা পাচ্ছেন সেটা ভেবে বের করুন এবং লিখতেই থাকুন। ঝিমিয়ে পড়া মানে লেখাকে গলা টিপে হত্যা করা।

সমাপ্তি : অসমাপ্ত বই কি কেউ পড়তে চাইবে? আমরা সেই বইটাই পড়তে চাই যেটায় আসলেই সমাপ্তি বলে কিছু আছে। কেবল লেখা শুরু করাটাই একজন সফল লেখকের প্রতিনিধিত্ব করে না, সেটাকে সার্থকভাবে শেষ করতে পারাটাই একজন সফল লেখকের সবচেয়ে বড়ো গুণ।

বই লেখার প্রথম ধাপ হলো–সূচনা। বইয়ের সূচনা কীভাবে হবে এই ব্যাপারে চারটি টিপস দিচ্ছি–

১.টপিক নির্ধারণ করুন।

একটা বই সবসময় টপিকের ওপর ভিত্তি করে লেখা হয়। তাই টপিক নিয়ে বিশেষভাবে ভাবতে হবে। প্রথমে টপিকটা মাথার ভেতর গুছিয়ে নিন, তারপর সেটার সারসংক্ষেপ একবাক্যে লিখুন, সেই বাক্যকে বিশ্লেষণ করে প্যারা বানান। নিজের ভেতর থেকে যে কথাগুলো বের হয়ে আসে সেগুলোই লিখুন। কাউকে রাজিখুশি করার জন্য লিখবেন না। নিজের দায়িত্ববোধ থেকে সত্যিটা বলার চেষ্টা করুন। চাইলে আনুষঙ্গিক বিষয়বস্তু যখন যা মনে আসে সেগুলোকে অন্য কোথাও মার্ক করে রাখতে পারেন, প্রয়োজনমতো ব্যবহার করা যাবে। প্রতিটি চ্যাপ্টারকে কয়েকটা সেকশনে ভাগ করে লিখুন। কলেবর বাড়াতে অযথা কোনো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করবেন না বা বাক্যকে জটিল করবেন না।

২. সময় বের করুন।

জন গ্রিশাম যখন লেখালিখিতে আসেন, তখন তিনি একজন ব্যাস্ত ল-ইয়ার এবং নতুন সন্তানের জনক। বলতে গেলে উনার কাছে তখন সময় ছিল অধরা। কিন্তু তারপরও তিনি ভোরে নিয়মিত ২-১ ঘণ্টা আগেভাগে উঠে ১ পৃষ্ঠা করে লিখতেন। ফলস্বরূপ ২ বছরের মাথায় তিনি তার প্রথম উপন্যাস লিখে ফেলেন! এক পৃষ্ঠায় মোটামুটি ৩০০ শব্দ লেখা যায়। তাই একদিনে অনেক বেশি লেখার চিন্তা বাদ দিন, প্রতিদিন নিয়মিত লেখার টার্গেট করুন। এতে আপনি আপনার টপিক নিয়ে বিস্তর চিন্তাভাবনা ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবেন। প্রতিদিনের লক্ষ্য স্থির করুন এবং সেই লক্ষ্যে এগিয়ে চলুন।

৩. প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে লিখুন।

সময়ানুবর্তিতা সৃজনশীলতাকে সহজ করে তোলে। তাই একটি নির্দিষ্ট সময়েই লিখতে বসুন। বোরড হলে ঘুরতে যেতে পারেন, কিন্তু হাল ছেড়ে দিলেই সব পরিশ্রম জলে যাবে। রুটিনটা সবসময়েই এমনভাবে ফলো করুন যেন ভেতর থেকে আপনা-আপনিই বুঝে যান–কখন লেখার সময় আর কখন অসময়।

৪. একটি নির্দিষ্ট পরিবেশ সিলেক্ট করুন।

আপনার নির্দিষ্ট পরিবেশটা হতে পারে কোনো ডেস্ক, বা কোনো রেস্তোরাঁ, অথবা আপনার প্রিয় কিচেন! পরিবেশটা কোথায় সেটা কোনো ব্যাপার না, কোন পরিবেশে লিখতে আপনি কমফোর্ট ফিল করেন সেটাই আসল কথা। তাই ভেবেচিন্তে লেখার পরিবেশ সিলেক্ট করুন, এমন একটি পরিবেশ বাছুন যেখানে যাওয়ামাত্র আপনার মাথায় শুধুই লেখালিখির বিষয়টা আসে, অন্য কিছু না। যে পরিবেশে গেলে আপনি বইটা শেষ করার তাগিদ অনুভব করবেন। যে পরিবেশে গেলে আপনার মাথায় অন্য কোনো চিন্তাভাবনা উঁকি দেবে না–এমন পরিবেশই বেছে নিন।

ধাপ-২

সাধনা।

আগেই জানিয়ে রাখি–এই সময়টায় খানিক ব্যাস্ত থাকা লাগবে। আমরা এখন বই লেখার দ্বিতীয় ধাপে পা রাখছি। এই ধাপে থাকছে ৩ টি টিপস।

৫. ফিরে দেখা এবং উপলব্দি।

আপনমনে লিখুন, একদম নিজের খেয়ালখুশিমতো। জোর করে একটা টপিক নিজের ওপর চাপিয়ে নিবেন না। লেখাটা আপনার কাছে হতে হবে আনন্দের। যতটুকুই লিখেছেন সেটা আবার খুঁটিয়ে দেখুন, হয়তো এখনো অনেক কাজ বাকি রয়ে গেছে, সেদিকে আপাতত না তাকিয়ে যতটুকু লিখতে পেরেছেন সেটা উপভোগ করুন। এতদিনে নিজের ভেতর একটা আত্মবিশ্বাস তৈরি হবার কথা। যদি মনে করেন আপনার দ্বারা লেখালিখি হবে তাহলে নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করুন, নিজেকে একটি সময়সীমা বেঁধে দিন। সেই সময়সীমার ভেতর লক্ষ্য অর্জন করতেই হবে–এমন মনোভাব রাখুন।

৬. শব্দগণনা এবং অধ্যায় বিন্যস্ত করা।

আচ্ছা কয় হাজার শব্দ হলো খেয়াল করেছেন? নূন্যতম ১০ হাজার শব্দ তো থাকা দরকার। আচ্ছা ধরলাম ১০ হাজার শব্দ হয়ে গেছে, তাহলে প্রতিটি চ্যাপ্টার সমান সাইজের হলো কি না একটু দেখুন তো। চ্যাপ্টারগুলো একই সাইজের হওয়াটা জরুরি। আর এই ফাঁকে আমি  শব্দপাঠ্যের সময়সীমা সম্পর্কে নিচে একটা ধারণা দেই-

১০ হাজার শব্দবিশিষ্ট লেখা, এর উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় একটি ছোট্ট পুস্তিকাকে। পড়তে পাঠকভেদে ৩০ থেকে ৬০ মিনিট লাগে।

২০ হাজার শব্দবিশিষ্ট লেখা, শর্ট ই-বুক বা ইশতেহার এই ক্যাটাগরিতে পড়ে। যেমন কমিউনিস্টদের ইশতেহার ছিল ১৮ হাজার শব্দের। পড়তে পাঠকভেদে ১-২ ঘণ্টা লাগার কথা।

৪০,০০০- ৬০,০০০ শব্দবিশিষ্ট লেখা, গড়পড়তা নন-ফিকশন বা উপন্যাস এই ক্যাটাগরিতে পড়ে। যেমন–দ্যা গ্রেট গ্যাটসবি। পুরোটা পড়তে পাঠকভেদে ৩-৪ ঘণ্টা লাগবে।

৬০,০০০- ৮০,০০০ শব্দবিশিষ্ট লেখা, লম্বা নন-ফিকশন বা গড়পড়তা লম্বা উপন্যাস। ম্যালকম গ্ল্যাডওয়েলের বেশিরভাগ বই এই ক্যাটাগরিতে পড়ে। পুরোটা পড়তে পাঠকভেদে ৪-৬ ঘণ্টা লাগবে।

৮০,০০০- ১০০,০০০ শব্দবিশিষ্ট লেখা, প্রমাণ সাইজের নন-ফিকশন বই বা লম্বা উপন্যাস। পড়তে লাগলে মিনিমাম ৭ ঘণ্টা লাগতে পারে।

১০০,০০০+ শব্দবিশিষ্ট লেখা, মহাকাব্য/অ্যাকাডেমিক বই/বায়োগ্রাফি। পড়ে শেষ করার মিনিমাম টাইম ৮ ঘণ্টা। যেমন স্টিভ জবসের বায়োগ্রাফি।

এবার আপনার স্বাচ্ছন্দ এবং পাঠকের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে লেখালিখি এগিয়ে নিন।

৭. পরামর্শ বা প্রতিক্রিয়া নিন।

চুপিচুপি একটা পাণ্ডুলিপি লেখার পর সেটাকে বাতিল করে আবার নতুন করে শুরু করার চেয়ে বাজে কিছু আর হতে পারে না। তাই, যাই লিখেন যেটুকুই লিখেন সেগুলো আপনার বিশ্বস্ত প্রিয়জন বা শুভাকাঙ্ক্ষীদের সাথে শেয়ার করুন। তারা অবশ্যই আপনাকে সঠিক পরামর্শ দেবে। তাই তাদের মতামত নিন, তাদের সমালোচনাকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনে নিজেকে শোধরান। তাদের কাছ থেকে নিজের মূল্যায়ন নিন।

ধাপ ৩

সমাপ্তি।

৮. ছড়িয়ে দেওয়া।

পাণ্ডুলিপি লেখার কাজ শেষ করলেন। তো এটাকে কি এখন ড্রয়ারে ফেলে রাখলে হবে? এটাকে এখন সবার কাছে তুলে ধরার সময়। পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশকের কাছে ধরনা দিন। বই প্রকাশের ব্যবস্থা করুন। অনলাইনেও (যেমন অ্যামাজনে) প্রকাশ করতে পারেন। বই প্রকাশ করার জন্য আপনাকে যা যা করার করতে হবে।

৯. ব্যর্থতাও হোক অনুপ্রেরণা।

শেষের দিকেই ঝামেলাটা বেশি হয়। গণ্ডগোলে মাথা ঠান্ডা রাখুন। সবধরনের পরিস্থিতির জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখুন। ব্যার্থতাকে আলিঙ্গন করতে শিখুন।

১০. এবং লিখে যান।

নতুন লেখকেরা তাদের প্রথম বই নিয়ে অনেক দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়ান, এটা কমবেশি সবারই হয়। এগুলো আমলে না নিয়ে প্রথম বই প্রকাশ করে আপনার যে কিছু মূল্যবান অভিজ্ঞতা হয়েছে বা যে অনুভূতিটুকু আপনি পেয়েছেন সেগুলোই স্বরণীয় করে রাখুন। বইটি পাবলিশ না হলে এইটুকুও তো আপনার অজানা থেকে যেত। যদি ব্যার্থ হয়ে থাকেন তাহলে সেখানেই থেমে না থেকে আবার শুরু করুন, চেষ্টা চালিয়ে যান সফল হওয়ার আগ পর্যন্ত। এটাই আপনার উন্নতির চাবিকাঠি। আপনাকে কলম আঁকড়ে ধরতে হবে এবং লেখা চালিয়ে যেতে হবে।

লেখকেরা হুট করে হয়ে যান না বা টুপ করে আকাশ থেকেও পড়েন না, একজন লেখক নিজেকে তৈরি করেন, তাকে কোথাও থেকে শুরু করতে হয়। এভাবে বেশিরভাগ লেখকেরই লেখক হয়ে ওঠার পথটা কখনোই মসৃণ হয় না। লক্ষ্য যতই নাক বরাবর থাকুক, সে লক্ষ্যে ছুটে চলার পথটা কণ্টকাকীর্ণ হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *