ডারউইন এর জগৎ (পর্ব-১)

ল্যাঙ্কাশায়ারের শ্রুসবেরি শহরে ১৮০৯ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি প্রথম পৃথিবীর আলো দেখি। ছয় ভাইবোনের মধ্যে আমি পঞ্চম। নাম- চার্লস রবার্ট ডারউইন। বাবা রবার্ট ডারউইন নামকরা ডাক্তার। দাদু ইরাসমাস ডারউইন তো ছিলেন আরও একধাপ এগিয়ে। একাধারে ডাক্তার, বিজ্ঞানী, লেখক, উদ্ভাবক, অনুবাদক,  দার্শনিক আবার কবিও! উনি Zoonomia নামে একটা বই ও লিখেছিলেন। সাহিত্যের কোনো বই না অবশ্য, বইটা ছিল জীবজগতের উৎপত্তি ও বিকাশ নিয়ে। ছোটবেলায়ই বইটি পড়েছিলাম, তখন অবশ্য আগামাথা কিছুই বুঝিনি।

এইটুকু পড়ে ভাবতেই পারেন আমার ফ্যামিলি খুব সেক্যুলার ছিল। কিন্তু আসলে ঠিক তা নয়, আমার ফ্যামিলি ছিল খুবই ধর্মভীরু একটি খৃষ্টান ফ্যামিলি।

আমার মা সুসানা ওয়েজউড যখন হঠাৎ মারা যান, তখন আমার বয়স খুবই অল্প, মাত্র ৮ বছর। সে সময়ের অনেক কিছুই আমার মনে নেই। মায়ের মৃত্যুশয্যা, কালো ভেলভেট কাপড়ের একটা গাউন বা অদ্ভুত শেইপের একটা টেবিল–এটুকুই আবছা মনে পড়ে। তো, সে বছরই বাড়ির পাশের স্কুলে আমাকে ভর্তি করে দেওয়া হলো। স্কুলে আসা-যাওয়া করি ঠিকই, কিন্তু পড়াশোনায় একদমই মন নেই।

মাতৃহীন হওয়ায় আদর-শাসনে কিছুটা ভাটা পড়ল, তাই খেয়ালীর মতো শ্রুসবেরির বনবাদাড়ে না-হয় মাঠেঘাটে ঘুরে বেড়াতাম, কখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেভার্ন নদীর তীরে এসে বসে থাকতাম। সম্ভবত দাদুর স্বভাব পেয়েছিলাম, প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে চাইতাম। সেই অল্প বয়সেই প্রচুর গাছপালার লাতিন নাম আত্মস্থ হয়ে যায়! রাজ্যের পোকামাকড়, ঝিনুক বা শামুকের খোল আর পাখির ডিমে ছিল যেন আমার সমস্ত কৌতুহল। এগুলোই ছিল সে সময়ের খেলার সাথী, আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

আমার এই খেয়ালীপনার মেয়াদ ছিল মাত্র এক বছর। বাবা আমাকে শহরের বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন। শুরু হলো আমার রুটিনমাফিক গৎবাঁধা জীবন। স্কুলমাস্টার ড. স্যামুয়েল বাটলার খুব কড়া শিক্ষক। অনিয়ম করলে বা পড়া না পারলে নিশ্চিন্তে ছাত্রদের বেত্রাঘাত করেন! আমার এরকম বাঁধাধরা পড়াশোনা কখনোই ভালো লাগেনি, মানিয়ে নিতে পারিনি আরকি।

বাবার খুব ইচ্ছে আমি ডাক্তার হই, আমার পড়াশোনার অবস্থা দেখে তাকে সেই ইচ্ছে মাটিচাপা দিতে হলো। পরিবর্তে উদয় হলো নতুন ইচ্ছে–আমাকে হতে হবে ধর্মযাজক!

যাজক হওয়ার জন্য ভর্তিও হলাম কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রাইস্ট কলেজে।

আহ! এখানে এসে পেয়ে গেলাম প্রচ্চুর স্বাধীনতা। যেন ফিরে এলো সেই ছেলেবেলা! দলবেঁধে চক্কর দিই, শিকার করি, পোকামাকড় ধরে ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি। পরিচিত হলাম উদ্ভিদবিদ্যার অধ্যাপক জন সিভেন্স হেনস্লো-র সাথে। প্রকৃতির অজানা রহস্যকে জানার ক্ষেত্রে উনি ছিলেন আমার প্রেরণাদাতা গুরু।

দাদুর সমসাময়িক ছিলেন জঁ-বাতিস্ত ল্যামার্ক। যারা ভাবতেন–“প্রাকৃতিক নিয়মেই প্রাণীর বিবর্তন ঘটছে” তিনি তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। ড. গ্র্যান্ট নামের একজন প্রাণিবিদের কাছে ল্যামার্কের তত্ত্ব সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি। ল্যামার্কের লেখাগুলো পড়া হয় তখনই। আরো পড়া হয় হামবোর্ড Personal narrative. হারসেল এর introduction to the study of natural filosofia.

এগুলো পড়ে আমি প্রকৃতিবিজ্ঞানে তুমুল আগ্রহী হয়ে উঠি। স্যার হেনস্লো আমাকে ভূতত্ত্ব পড়তে উৎসাহ দেন। মনে পড়ে যায় ছোট্টবেলায় পড়া দাদুর সেই Zoonomia বইটির কথা। প্রায় একযুগ পর আবার খুলে পড়তে বসি বইটি, কিন্তু হতাশ হই। কারণ তিনি বেশিরভাগই অনুমানের ওপর মেরে দিয়েছেন! তবে বইটির কিছু বিষয় আমার মনে নতুন ভাবনার জন্ম দেয়। যেমন বইটির কোনো এক পৃষ্টায় লেখা ছিল- “সম্ভবত সব উষ্ণ রক্তের প্রাণীরা একই সূত্র থেকে এসেছে”

১৮৩১ সালের ২৭শে ডিসেম্বর, ২২ বছরের তরুণ আমি তখন। প্লিমাউথ বন্দরে অপেক্ষা করছে সমুদ্রজাহাজ ‘এইচ এম বিগল’। স্যার হেনস্লো সব ব্যাবস্থা করে দিয়েছেন। বিদায়কালে একটি বইও গিফট করেছেন, প্রখ্যাত ভূতাত্ত্বিক চার্লস লায়েলের লেখা Principle of Geology. আর বলে দিয়েছেন- বাছা, সময় কাটানোর জন্যই পড়তে দিলাম, তবে সাবধান, এই বইয়ের সবকিছু নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা না করাই ভালো, গড আর বাইবেলের বিরুদ্ধে উলটা-পালটা লেখা আছে!

উনি হয়তো তখন ভুলে গিয়েছিলেন–নিষিদ্ধ বিষয়ের প্রতিই মানবের যত আগ্রহ!

যাইহোক, স্যার হেনস্লো-র অবদানে ‘প্রকৃতিবিজ্ঞানী’ ট্যাগ লাগিয়ে চেপে বসলাম এইচ এম বিগল জাহাজে। এ এক দীর্ঘ অভিযান। সে অভিযানের অভিজ্ঞতা নিয়েই লিখব পরবর্তীতে…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *