আলোর সাত রঙ

আলো আলো আমি কখনো খুঁজে পাব না।

চাঁদের আলো তুমি কখনো আমার হবে না !

নাহ ! শিল্পীর এই ভুল ধারণা ভাঙাতে হবে ! এদিকে আসুন, এই আমি আপনাকে খুঁজে দেব আলো! শুধু চাঁদের আলো না, জগতের সব আলোই (আলোর ডিটেইলস আরকি!) আপনার নখদর্পনে চলে আসবে! শুরু করি-

আলো বলতে কী বুঝি?

আমজনতা দিনের বেলায় বুঝে সূর্য, আর রাতে বুঝে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ ! লোডশেডিং মানে জীবনডা আন্ধাইর, ত্যানাত্যানা।

কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীরা বুঝে নিরাশার অমানিশার পর আশার যে নতুন ভোর আসে সেটাই আলো !

স্যার আইজ্যাক নিউটন এইসব বোঝায় সন্তুষ্ট হলেন না ! তিনি সূর্যের সাদা আলোকে একপ্রকার কাঁচের (প্রিজমের) ভেতর দিয়ে পাস করালেন। সূর্যের এক পিস সাদা আলো ভেঙে সাতটা পিস হয়ে গেল! এই সাতটা পিসের আবার আলাদা সাতটা রঙ!

তো এ থেকে কী সিদ্ধান্তে আসা যায়?

বিশিষ্ট প্যারানরম্যাল বিশেষজ্ঞের সিদ্ধান্ত–“এটা নির্দেশ করে জগতে সাতটি মাত্রা আছে, আমরা ত্রিমাত্রিক প্রাণী হয়ে এসব বুঝতে পারিনা। আলোকে প্রিজমের ভেতর নেওয়ায় আলো সপ্তমাত্রিক হয়ে গেছে। আর এসব কারসাজির পেছনে অন্য মাত্রার অশরীরী প্রাণীদের হাত আছে, এরা থাকে কোহকাফ নগরে! অতএব কোহকাফ নগর প্রমাণিত!”

জনৈক প্রোপাগান্ডা বাস্তবায়নে রত ব্যক্তির সিদ্ধান্ত–“আমার চৌদ্দ পুরুষ আগের পরদাদা জনাব আড়িয়াল খাঁ একদা স্বপ্নে প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হইয়া একখানা পুস্তক রচনা করেন, যা কোনোমতেই উনার মনগড়া কিছু নহে। আমি গতকল্য সেই পুস্তকখানা খুলিয়া উহার ৩১৩ নং অধ্যায়ে দেখিয়াছি সেখানে লিখা–

“জগতে সাত ধরনের আলু আছে, এই ভিন্ন ভিন্ন আলুর স্বাদ এক নহে”

বিজ্ঞানমনস্ক মাত্রই বুঝিবে যে আমার চৌদ্দতম উর্ধতন পূর্বপুরুষ আড়িয়াল খাঁ এখানে ‘আলু’ বলিতে ‘আলো’ বুঝাইয়াছেন! অতএব ইহা কোনো সাধারণ পুস্তক নহে। ইহা প্রত্যেক বইমেলায় বেস্টসেলার হওয়ার যোগ্যতা রাখে!”

এবং স্যার আইজ্যাক নিউটনের সিদ্ধান্ত–“সূর্যের আলোতে সাতটি দৃশ্যমান রঙের পার্থক্য থাকে, এগুলো হলো-

বেগুনি

নীল

আসমানী

সবুজ

হলুদ

কমলা

লাল

প্রত্যেক রঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্য ভিন্ন। তাই কাঁচের ভেতর দিয়ে পাস হবার সময় এরা নিজ তরঙ্গদৈর্ঘ্য অনুযায়ী বিভিন্ন কোণে বেঁকে যায়।”

ওপরের সব সিদ্ধান্তই প্রোপাগান্ডা। একমাত্র স্যার আইজ্যাক নিউটনের সিদ্ধান্তই আসল সাইন্স। বুঝলেন কিছু?

ভাদ্রের গরমে তাল পাকে। কুকুর এই গরম সহ্য করতে না পেরে তিরিক্ষি হয়ে পথচারীদের দিকে তেড়ে যায় (কিংবদন্তি)। তাই এই গরমকে কুত্তাপাগল গরম বলে। তো এই কুত্তাপাগল গরমে আপনি আপনার রুমে বসে আছেন, আর স্থির সিলিংফ্যানটার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে মনে মনে বিদ্যুৎ বিভাগের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করছেন!

দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর বিদ্যুৎ সাহেব এলেন। বিদ্যুৎ সাহেবের মোহনীয় স্পর্শে অভিভূত হয়ে সিলিংফ্যানটা সাঁই সাঁই করে ঘুরতে শুরু করল! এখন আর ব্লেড তিনটাকে আলাদাভাবে শনাক্ত করা যাচ্ছে না! মনে হচ্ছে সিলিংফ্যানের চারপাশে গোল একটা চাকতি! অনেকটা চাঁদ বা সূর্যের চারপাশে যে ‘হ্যালো’ তৈরি হয়, তার মতো। ঘুরন্ত সিলিংফ্যান দেখিয়ে কাউকে প্রশ্ন করলে সে কি বলতে পারবে এই ফ্যানে কয়টা পাখা আছে? নাহ, পারবে না। কারণ একটা নির্দিষ্ট গতির চেয়ে বেশি গতিতে ঘুরলে আমরা সেটাকে আর আলাদাভাবে দেখতে পারব না।

অ্যাঙ্গুলার ডিসপ্লেইসমেন্ট :

দেখার ক্ষেত্রে আসলে গতি কোনো ফ্যাক্ট না। মানে “শুধু প্রচণ্ড গতিশীল হলেই কোনোকিছু আমরা আলাদাভাবে অবজার্ভ করতে পারব না” –এমন নয়। আপনার নাকের ডগার সামনে দিয়ে একটা চিল উড়ে গেলে আপনি চিলটাকে ঝাপসা দেখবেন, কিন্তু চিলটা একই গতিতে ১ মাইল ওপর দিয়ে উড়ে গেলে আগের তুলনায় অনেক স্লো মনে হবে। এটাকে বলে ‘অ্যাঙ্গুলার ডিসপ্লেইসমেন্ট’। তাই দৃশ্যের পরিসর কতটুকু এবং দৃশ্যটা আপনার ভিউপয়েন্ট থেকে কত দূরে–এগুলোর ওপরও আলাদাভাবে অবজার্ভ করা না করাটা নির্ভর করে।

আমাদের ভিউপয়েন্ট থেকে যদি কোনো সিলিংফ্যানের ব্লেড সেকেন্ডে ১০০-২০০ ডিগ্রি পাঁক খায় তাহলে আমরা ব্লেডগুলোকে আলাদাভাবে অবজার্ভ করতে পারব না। এটা হচ্ছে আমাদের চোখের সীমাবদ্ধতা। আর চোখের এই সীমাবদ্ধতাকে কাজে লাগিয়ে ইলুমিনাতিরা কীভাবে আমাদের বোকা বানাচ্ছে দেখুন-

সিনেমা হলের প্রজেক্টর বা হাল আমলের জনপ্রিয় কমিক্স সিরিজগুলিতে ‘ভিডিয়ো’ বলতে কিছুই থাকে না! ক্যামনে কী? ধরেন এক মিনিটের একটা দৃশ্য, এই দৃশ্যের প্রতি ১০ মিলিসেকেন্ড পরপর একটা করে স্ক্রিনশট নেওয়া হচ্ছে। মিলিসেকেন্ড হলো ১ সেকেন্ডের ১ হাজার ভাগের ১ ভাগ। তাহলে এক সেকেন্ড পর কয়টা স্ক্রিনশট হবে?

কারেক্ট, ১০০০÷১০=১০০টা।

তাহলে এক মিনিটে?

হুম, ১০০×৬০= ৬০০০ টা।

এই ৬ হাজার স্ক্রিনশটকে লম্বা একটা ট্রেইনের গায়ে একটার পর একটা পর্যায়ক্রমে সেঁটে দিলাম, এবার আপনাকে রেলস্টেশনে দাঁড় করিয়ে রেখে ট্রেইনটাকে আপনার ভিউপয়েন্ট থেকে ২০০ ডিগ্রি স্পিডে চালিয়ে দিলাম, আপনি ট্রেইনের দিকে তাকিয়ে কী দেখবেন জানেন? পুরো ওই একমিনিটের দৃশ্যটির ভিডিয়ো! এইভাবে লক্ষকোটি স্থিরচিত্র পরষ্পর সাজিয়ে তৈরি হয় একেকটি চলচ্চিত্র! পুরো ভিডিয়োটি দেখুন, বিশ্বাস না করে এড়িয়ে যাবেন না প্লিজ…

এবং একটা থট এক্সপেরিমেন্ট :

ভিডিও দেখা শেষ? এবার আসুন একটা থট এক্সপেরিমেন্ট করি। মনে মনে ভেবে নিই এমন একটা সিলিংফ্যান যেটাতে সাতটি ব্লেড আছে। সাতটি ব্লেড আবার সাত রঙের, প্রথম ব্লেডের রং বেগুনি, দ্বিতীয়টির নীল, পরেরটি আসমানি, তারপর যথাক্রমে সবুজ হলুদ কমলা এবং লাল। এই হলো সাতটি ব্লেডের সাতটি রং। ফ্যানটি বন্ধ তাই রঙিন ব্লেডগুলো আলাদাভাবে দেখা যাচ্ছে। রাইট? এবার সুইচ টিপে ফ্যানটা চালু করে দেই, ধরুন আপনার ভিউপয়েন্ট থেকে ফ্যানটা এখন সেকেন্ডে ২০০ ডিগ্রি বেগে ঘুরছে। অনুমান করুন তো এক্ষেত্রে কী হতে পারে? রঙগুলো কি আর আলাদাভাবে দেখা যাবে? যাবে না, তার ওপর আপনি অবাক হয়ে দেখবেন ফ্যানের ব্লেডগুলো ঘুরে ঘুরে যে ‘হ্যালো’ তৈরি হয়েছে সেই গোলকটাকে সাদা দেখা যাচ্ছে! সাতটা রঙ্গের সবগুলো গায়েব হয়ে গেছে! জায়গাটা দেখা যাচ্ছে সাদা! কিন্তু কেন?

বিশ্লেষণ থাকবে নেক্সট পর্বে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *