অ্যান্ড্রোমিডা, গ্যালাক্সিপাড়ার বড়োভাই

অ্যান্ড্রোমিডা, গ্যালাক্সিপাড়ার বড়োভাই

জন্মবৃত্তান্ত :

আজ থেকে প্রায় ১ হাজার কোটি সাল (১০,০০০,০০০,০০০) আগের কথা, মহাকাশের কোল জুড়ে জন্ম নিয়েছিল একটা গ্যালাক্সি। কয়েকটা প্রোটোগ্যালাক্সির রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং সংঘর্ষ পরবর্তী মিলনের ফলে এর গোলাকার চাকতি তৈরি হয় এবং গ্যালাক্টিক হ্যালো এর চারপাশে ছড়িয়ে যায়। গ্যালাক্টিক হ্যালো হচ্ছে গ্যালাক্সির চারদিক ঘিরে থাকা আলোর আভা। তো, সেই সংঘর্ষের পর থেকে কোটি কোটি বছর যাবত এর ভেতর প্রচুর তারা জন্ম নিচ্ছিল। অবস্থা এমন হয়েছিল যে আলোর তীব্রতার জন্য এটি একটি ইনফ্রারেড গ্যালাক্সিতে পরিণত হয়েছিল। ইনফ্রারেড গ্যালাক্সি হচ্ছে সেইসব গ্যালাক্সি যারা লালের চেয়েও তীব্র আলো বিকিরণ করে, যেটা খালি চোখে দেখা যায় না। মোদ্দাকথা, তখন গ্যালাক্সিটি আমাদের সূর্যের চেয়েও ১০ হাজার কোটি (১০০,০০০,০০০,০০০) গুণ বেশি উজ্জ্বল ছিল। তবে মোটামুটি ২০০ কোটি (২,০০০,০০০,০০০) বছর ধরে এর নক্ষত্র তৈরির হার এবং উজ্জ্বলতা দুটোই হ্রাস পেয়েছে।

নামকরণ :

পারস্যের জ্যোতির্বিদ আব্দুর রহমান আল-সুফি ৯৬৪ সালে তার বই ‘কিতাব সুয়ার আল কাওয়াকিব’ এ সর্বপ্রথম গ্যালাক্সিটির উল্লেখ করেন। কিন্তু সেই সময়ে গ্যালাক্সি সম্পর্কে মানুষের ধারণা না থাকায় তিনি একে ‘ক্ষুদ্র মেঘ’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

১৭৮১ সালে চার্লস মেসিয়ের নামক একজন ফরাসি জ্যোতির্বিদ ও ধূমকেতু পর্যবেক্ষক ১০৩ টি জ্যোতির্ময় বস্তু চিহ্নিত করেন যাতে করে অন্য কেউ এগুলোকে ধূমকেতু ভেবে ভুল না করে। এই তালিকাকে ‘মেসিয়ের তালিকা’ বলা হয়। মেসিয়েরের তালিকায় যেমন মিল্কিওয়ের ভেতরের বস্তু ছিল, তেমনি এই গ্যালাক্সির মতো বাইরের বস্তুও ছিল। মেসিয়ের গ্যালাক্সিটির নাম দিয়েছিলেন ‘মেসিয়ের-৩১’। তবে গ্রিক পুরাণে বর্ণিত ইথিওপিয়ার রানী এবং পার্সিয়াসের স্ত্রী ‘অ্যান্ড্রোমিডার’ নামানুসারেই এই গ্যালাক্সি বেশি পরিচিত।

বাসস্থান :

অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি বাস করে আমাদের থেকে ২৫ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে, সে আমাদের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী সর্পিল গ্যালাক্সি। পরিষ্কার আকাশে তাকে খালি চোখে অস্পষ্ট কুয়াশার মতো দেখা যায়। পৃথিবী থেকে তাকে দেখতে হলে প্রথমে যেতে হবে আলোকদূষণমুক্ত অঞ্চলে। তারপর তাকাতে হবে মিল্কিওয়ের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের ঘন জায়গার ঠিক নিচে। সেখানে ইংরেজি W আকৃতির অ্যান্ড্রোমিডা নক্ষত্রমণ্ডলের দুটো নক্ষত্র ক্যাসিওপিয়া এবং প্যাগাসাসের গ্রেট স্কয়ারের মধ্যে একে অস্পষ্ট কুয়াশার মতো ঝাপসা দেখা যাবে। উত্তর গোলার্ধে অ্যান্ড্রোমিডাকে দেখার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হচ্ছে শরত ও শীতকাল। দক্ষিণ গোলার্ধ থেকে দেখতে হলে বসন্তকাল আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এছাড়াও নভেম্বর-ডিসেম্বরে মধ্য-উত্তর অক্ষাংশ থেকে অ্যান্ড্রোমিডাকে আমাদের মাথার ওপরের সর্বোচ্চ পয়েন্ট ‘সুবিন্দু’তে দেখতে পাওয়া যায়।

পরিচয় বৃত্তান্ত :

মহাবিশ্বে আমাদের অংশে ছোটোবড়ো ৫৪ টি গ্যালাক্সির একটি ‘লোকাল গ্রুপ’ আছে। অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি হলো এই গ্রুপের সবচেয়ে বড়ো গ্যালাক্সি। মিল্কিওয়ের মতো অ্যান্ড্রোমিডাও স্পাইরাল আকৃতির গ্যালাক্সি। তবে মিল্কিওয়ের চেয়ে অ্যান্ড্রোমিডা গায়ে-গতরে অনেক বড়ো। ব্যাস প্রায় ২ লক্ষ ২০ হাজার আলোকবর্ষ। এর ডিস্কের পুরুত্বও বিশাল, প্রায় ১ হাজার আলোকবর্ষ। এই বিশাল চাকতি জুড়ে অগণিত নক্ষত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সাতটি বাঁকানো বাহু নিয়ে গঠিত এই গ্যালাক্সিটি, এর মধ্যে দুটো বাহু এর কেন্দ্রের সাথে সংযুক্ত। বাকি পাঁচটি বাহু অসংখ্য প্ল্যানেটারি সিস্টেমকে আঁকড়ে আছে। বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন অ্যান্ড্রোমিডার নক্ষত্রসংখ্যা হতে পারে প্রায় ২ লক্ষ কোটি। ২ এর পর ১২ টি শূন্য বসালে যা হয় আরকি! যা মিল্কিওয়ের নক্ষত্রসংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি, জানিয়ে রাখি, মিল্কিওয়ের আনুমানিক নক্ষত্রসংখ্যা ২০-৪০ হাজার কোটি। এতকিছুর পরও অ্যান্ড্রোমিডার ভর আমাদের মিল্কিওয়ের চেয়ে কম, অ্যান্ড্রোমিডার ভর ১ লক্ষ ২৩ হাজার কোটি (১,২৩০,০০০,০০০,০০০) সৌরভরের সমান। যেখানে আমাদের মিল্কিওয়ের ভর ১ লক্ষ ৫০ হাজার কোটি (১,৫০০,০০০,০০০,০০০) সৌর ভর। কারণ একটাই, আমাদের মিল্কিওয়েতে ডার্ক ম্যাটারের সংখ্যা অ্যান্ড্রোমিডার চাইতে বেশি। ডার্ক ম্যাটার সম্পর্কে সংক্ষেপে একটু বলি : ডার্ক ম্যাটার হচ্ছে এমন অদ্ভুত পদার্থ যারা শুধু গ্র‍্যাভিটির সাথে মিথস্ক্রিয়া করে, বাকি তিনটি মৌলিক বল বা ফোটনের সাথেও এদের মিথস্ক্রিয়া নেই। তাই এদের ধরা বা ছোঁয়া যায় না, দেখাও যায় না। শুধু গ্র‍্যাভিটির টান অনুভব করা যায়। এরকম অদ্ভুত পদার্থ দিয়ে আমাদের মহাবিশ্ব ভর্তি। আমাদের মহাবিশ্বে ডার্ক ম্যাটার আছে শতকরা ২৬.৮%। এবং সেই তুলনায় দৃশ্যমান পদার্থ আছে মাত্র ৪.৯%। মহাবিশ্বের বাকি ৬৮.৩% হলো ডার্ক এনার্জি।

কর্মজীবন :

অ্যান্ড্রোমিডার কর্মজীবন যথেষ্টই আড়ম্বরপূর্ণ। গ্যালাক্সিটি তীব্র গতিতে নিজ অক্ষের চারপাশে ঘুরছে। গ্যালাক্সিটির ভেতরের অংশ এক পাক ঘুরে আসতে প্রায় ১১০ লক্ষ বছর সময় লাগে। বাইরের অংশে সময় লাগে প্রায় ৯-২০ কোটি বছর। নক্ষত্র তৈরির প্রতিযোগিতায় অ্যান্ড্রোমিডা অবশ্য বর্তমানে মিল্কিওয়ের চাইতে পিছিয়ে। মিল্কিওয়ের ভর যেখানে বছরে ৩-৫ সৌর ভর হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে সেখানে অ্যান্ড্রোমিডার ভর বৃদ্ধির হার বছরে মাত্র ১ সৌর ভর। এমনকি মিল্কিওয়েতে নক্ষত্র বিস্ফোরণের সংখ্যাও অ্যান্ড্রোমিডার চাইতে দ্বিগুণ। এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে মিল্কিওয়ে অ্যান্ড্রোমিডার চাইতে উজ্জ্বল গ্যালাক্সিরূপে আবির্ভূত হবে। সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি কম্পিটিশনে অ্যান্ড্রোমিডা ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে তার ভেতর তৈরি হয়েছে এক প্রচণ্ড আক্রোশের। মনে হচ্ছে সে মিল্কিওয়েকে এমনি এমনিই ছেড়ে দিবে না। দেখা যাক শেষতক কী ঘটে…

দাম্পত্যজীবন :

সাতটি বাঁকানো বাহু, নিউক্লিয়াসে ২৬ টি কেন্দ্রীয় ব্ল্যাকহোল, ১ টি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল, দুটো বাইনারি ব্ল্যাকহোল এবং ২ লক্ষ কোটি নক্ষত্র নিয়ে অ্যান্ড্রোমিডার বিশাল পরিবার। এর সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের ভর হচ্ছে প্রায় ১১ থেকে ২৩ কোটি সৌরভরের সমান। যেখানে মিল্কিওয়ের সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের ভর ‘মাত্র’ ৪২ লক্ষ সৌর ভর! এছাড়াও অ্যান্ড্রোমিডাকে ঘিরে চক্কর দিচ্ছে ২০ টির মতো উপগ্যালাক্সি, যার মধ্যে অন্যতম দুটো হচ্ছে M32 এবং M1110. ধারণা করা হয় M32 উপগ্যালাক্সিটি একসময় নিজেই একটি বিশাল গ্যালাক্সি ছিল, অ্যান্ড্রোমিডার সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে এর বেশিরভাগ অংশই এখন অ্যান্ড্রোমিডার পরাধীন। প্রচলিত একটা ভুল ধারণা হলো অ্যান্ড্রোমিডা হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে কাছের গ্যালাক্সি। কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে এন্ডোমিডা এবং মিল্কিওয়ের মধ্যবর্তী আরও ২০ টি ছোটোবড়ো গ্যালাক্সি রয়েছে। বরং এভাবে বলা যায়- সর্পিল গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যে আমাদের সবচেয়ে কাছের গ্যালাক্সি হচ্ছে অ্যান্ড্রোমিডা।

এবং বুম :

প্রতিশোধের কথা বলছিলাম না? সেই প্রতিশোধের নেশায় মিল্কিওয়ের দিকে এগিয়ে আসছে অ্যান্ড্রোমিডা। প্রতি সেকেন্ডে ১১০ কিলোমিটার বেগে তেড়ে আসছে সে। যদিও স্পেইস সম্প্রসারণের সাথে পাল্লা দিয়ে দুটো গ্যালাক্সির মধ্যকার দূরত্ব বাড়ার কথা। তারপরও খুব কাছাকাছি অবস্থিত এ দুটো গ্যালাক্সি একে অপরের প্রতি মহাকর্ষের টান উপেক্ষা করতে পারছে না। ভবিষ্যতে এ দুটো গ্যালাক্সি একত্রিত হয়ে একটি দৈত্যাকার গ্যালাক্সি গঠন করবে। তখন পর্যন্ত কি আমাদের বংশধরেরা বেঁচে থাকবে? আমরা যে দুটো গ্যালাক্সির মিলিত রূপের নাম দিয়েছি ‘মিল্কোমিডা’। তখন কি এই নাম ধরে ডাকার মতো কেউ থাকবে? দুটো গ্যালাক্সির সংঘর্ষকালে কী দশা হবে আমাদের প্রিয় সৌরজগতের? কেমন থাকবে আমাদের প্রিয় পৃথিবীটা? হয়তো কোনোকিছুর ধাক্কায় পুরো সৌরজগতটাই প্রচণ্ড গতিতে নিরুদ্দেশ্যে ছিটকে যাবে। অথবা তার আগেই হয়তো সূর্যটা রেড জায়ান্টে পরিণত হয়ে পৃথিবীসহ আরও কয়েকটা গ্রহকে থাবা বসিয়ে টেনে নিবে নিজের কাছে। এতে প্রকৃতির কিছু আসে যায় না। মহাবিশ্বের একটি সাধারণ গ্যালাক্সির মধ্যবিত্ত নক্ষত্রের ছোট্ট একটি গ্রহে তিলে তিলে বেড়ে ওঠা এই মানবীয় আবেগ মহাজাগতিক ঘটনাবলির কাছে নিতান্তই মূল্যহীন, তুচ্ছ।।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *